৮ জুলাই দুপুর ২টার দিকে সাংবাদিকেরা লক্ষ করেন, তুরস্কের নিরাপত্তা বাহিনী অস্বাভাবিকভাবে আঙ্কারা বিমানবন্দরে বাড়তি ইউনিট মোতায়েন করছে; সেখানেই রাখা ছিল ট্রাম্পের ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’। ৭-৮ জুলাই ন্যাটো সম্মেলনের জন্য পুরো আঙ্কারা কার্যত অবরুদ্ধ ছিল। রাস্তা বন্ধ, ফুটপাত অকার্যকর এবং সরকারি কর্মচারীদের এক সপ্তাহের ছুটি ঘোষণা করায় গোটা শহরটি ছিল প্রায় জনশূন্য।
সন্দেহভাজন হামলার প্রতিবেদন
তুরস্কের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা সূত্রগুলো এমইই-কে জানিয়েছে, ইসরাইলের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছিল যে ইরানের একটি গোপন অভিযান ইউনিট আঙ্কারা বিমানবন্দরের কাছে ট্রাম্পের নতুন ‘এয়ার ফোর্স ওয়ানকে’ লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। একজন সূত্র বলেন, ‘ধারণা করা হচ্ছিল, ইরানিরা এক কিলোমিটারের মধ্যে ম্যানপ্যাডস নামে পরিচিত কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে বিমানটিকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।’
তুরস্কের রাজধানীর প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এসেনবোগার বিপরীতে আঙ্কারা বিমানবন্দরটি বেসামরিক ভবনে ঘেরা, যেগুলোর কিছু কিছু রানওয়ে থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে। এই কারণে তুরস্কের কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়। ইউএস সিক্রেট সার্ভিস আরও নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিতে চেয়েছিল বলে জানা গেছে। প্রথমে ট্রাম্পের প্রস্থানের স্থান আঙ্কারা বিমানবন্দর থেকে সরিয়ে এসেনবোগা বিমানবন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর নতুন বিমানটির বদলে পুরনো ‘এয়ার ফোর্স ওয়ানকে’ ফিরিয়ে আনা হয়, কারণ পুরনো বিমানটিতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল, যা নতুনটিতে ছিল না।
ট্রাম্পকে হত্যার ইরানি প্রচেষ্টার কথা অনেক মার্কিন কর্মকর্তার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছিল। কারণ এর আগেও দুবার ইরান এমন প্রচেষ্টা চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পাকিস্তানি নাগরিক আসিফ মার্চেন্টকে মার্কিন রাজনীতিকদের, যার মধ্যে ট্রাম্পও ছিলেন, হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ২০২৪ সালের নভেম্বরে আফগান নাগরিক ফরহাদ শাকেরির বিরুদ্ধে ট্রাম্পকে হত্যার পরিকল্পনার অভিযোগ আনে মার্কিন বিচার বিভাগ। যদিও ইরান বরাবরই ট্রাম্প বা অন্য কোনো মার্কিন কর্মকর্তাকে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।
সিক্রেট সার্ভিস প্রতিবেদনটিকে এতটাই গুরুত্ব দিয়ে নিয়েছিল যে, ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প পুরনো ‘এয়ার ফোর্স ওয়ানে’ ওঠার পর তাকে গোপনে সেখান থেকে সরিয়ে নেয়া হয়। একটি খাবার সরবরাহকারী ট্রাকে করে তাকে সঙ্গে থাকা মার্কিন সরকারের অন্য একটি ‘সি-৩২’ বিমানে নিয়ে যাওয়া হয়। তুরস্কের এক কর্মকর্তা এমইই-কে নিশ্চিত করেছেন, মার্কিন কর্মকর্তারা ওই সি-৩২ বিমানের জন্য বাড়তি অবতরণ অনুমতি এবং শেষ মুহূর্তের কিছু পরিবর্তনের জন্য চাপ দিয়েছিলেন। এতে আঙ্কারার মনে হয়েছে, কোথাও একটি গরমিল রয়েছে।
ইসরাইলি ষড়যন্ত্রের সন্দেহ
ইসরাইলি গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি এমন একটি স্পর্শকাতর সময়ে এসেছিল যখন ট্রাম্প যুদ্ধ অবসান এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়ার বিষয়ে ইরানের সঙ্গে দর-কষাকষি করছিলেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের সঙ্গে বৈঠককালে ট্রাম্প বারবার বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হয়েছে এবং আলোচনা নিয়ে আশাবাদী তিনি। ওই বৈঠকে থাকা একটি সূত্র এমইই-কে এই তথ্য জানিয়েছে।
ট্রাম্পের এই অবস্থান ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহুর ইচ্ছার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। নেতানিয়াহু বরং ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা জোরদার এবং ইরানি নেতাদের হত্যার নতুন অভিযানসহ যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার পক্ষে ছিলেন।
তুরস্কের কর্মকর্তারা এখন মনে করছেন, ইসরাইলি গোয়েন্দা প্রতিবেদনটি সম্ভবত নেতানিয়াহু সরকারের একটি কৌশল ছিল। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের ট্রাম্পের রক্ষক হিসেবে দেখাতে, ইরানের সঙ্গে আলোচনা ভেস্তে দিতে এবং এরদোয়ানের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে দুর্বল করতে চেয়েছিল। বৈঠকে ট্রাম্প ২০১৯ সালে তুরস্কের রুশ ‘এস-৪০০’ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কেনার কারণে আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া এবং আঙ্কারার কাছে ‘এফ-৩৫’ যুদ্ধবিমান বিক্রির ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন। ইসরাইলের ‘গুণগত সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব’ (কিউএমই) নষ্ট হবে এই যুক্তিতে নেতানিয়াহু তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ বিক্রির তীব্র বিরোধী।
এই বিষয়ে অবগত একজন সূত্র বলেন, ‘অবশ্যই আমরা প্রতিবেদনটিকে অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে নিয়েছিলাম এবং মার্কিন সহকর্মীদের যথাসাধ্য সহায়তা করেছি। তবে আমাদের কাছে এটি একেবারে পরিষ্কার ছিল যে, এই প্রতিবেদনটি সত্য হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই।’ যদিও ইরানি ঘাতক দল অতীতে তুরস্কে ইরানি ভিন্নমতাবলম্বীদের অপহরণ বা হত্যা করেছে, তবে তেহরান কখনো সাধারণ আগ্নেয়াস্ত্রের বাইরে কোনো জটিল অভিযান চালানোর সাহস দেখায়নি।
এমন ধরনের হামলার জন্য তুরস্ক সম্পর্কে বিস্তৃত জ্ঞান, নিরাপদ আস্তানা, আঙ্কারায় প্রবেশ ও বের হওয়ার গোপন রাস্তা এবং সম্মেলনের আগে অসংখ্য চেকপোস্ট পার হয়ে ম্যানপ্যাডস পরিবহনের প্রয়োজন হতো। এ ধরনের কোনো চেষ্টা তুরস্ককে ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে দিতে পারত, যদিও যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আঙ্কারা তেহরানের সঙ্গে অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রেখেছে। আঙ্কারার এক অভ্যন্তরীণ সূত্র এমইই-কে বলেন, ‘সম্মেলনের এক মাস পরই ট্রাম্পকে রক্ষায় সিক্রেট সার্ভিসের অভিযানের বিবরণ ফাঁস হওয়াটা রীতিমতো হাস্যকর। আমি ধারণা করছি, যেই হামলা কখনো ঘটেইনি এবং সম্ভবত পরিকল্পনাই করা হয়নি, তার জন্য তাদের কিছু নায়ক দরকার।’





