গত ১৪ সেপ্টেম্বর ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফে বৈঠক করেন স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের নেতারা। বৈঠকের পর প্রকাশিত এক সমঝোতা স্মারকে তারা প্রতিটি অঞ্চলের সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুতি, পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে যুক্তরাজ্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের অধিকার দাবি করেন তারা।
বৈঠকটিকে নজিরবিহীন বলে বর্ণনা করেছে যুক্তরাজ্যের কয়েকটি সংবাদমাধ্যম। স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে বর্তমানে যথাক্রমে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি, প্লাইড কামরি ও সিন ফেইন ক্ষমতায় রয়েছে। দল তিনটি স্বাধীনতা কিংবা যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সাংবিধানিক সম্পর্ক পরিবর্তনের পক্ষে। আধুনিক ব্রিটিশ ইতিহাসে এমন রাজনৈতিক পরিস্থিতি আগে দেখা যায়নি।
তবে সরকার পরিচালনাকারী দলগুলোর স্বাধীনতাপন্থি অবস্থান এবং যুক্তরাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া ও জনসমর্থন এক বিষয় নয়। তিন অঞ্চলের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতাও আলাদা।
স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে বিচ্ছিন্নতার আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘদিনের। তবে সময়ের সঙ্গে এর মাত্রা বদলেছে। সাংবিধানিকভাবে যুক্তরাজ্য একক রাষ্ট্র হলেও রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে অঞ্চল তিনটির বিকাশ ঘটেছে ভিন্ন পথে।
তিন অঞ্চলে সাংবিধানিক অবস্থান পরিবর্তনের জন্য গণভোট আয়োজনের আইনও এক নয়। বেলফাস্ট চুক্তি ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড অ্যাক্ট ১৯৯৮ অনুযায়ী, উত্তর আয়ারল্যান্ডই যুক্তরাজ্যের একমাত্র অংশ, যেখানে সাংবিধানিক অবস্থান নিয়ে গণভোটের বিধিবদ্ধ ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে এমন গণভোট আয়োজনের আগে স্পষ্ট ইঙ্গিত থাকতে হবে যে উত্তর আয়ারল্যান্ডের অধিকাংশ মানুষ সাংবিধানিক পরিবর্তন সমর্থন করতে পারেন। গণভোট ডাকার ক্ষমতাও যুক্তরাজ্য সরকারের হাতে।
স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার গণভোট আয়োজনের কোনো স্থায়ী আইনি ব্যবস্থা নেই। ২০১২ সালের এডিনবরা চুক্তির মাধ্যমে ২০১৪ সালে একবারের জন্য স্বাধীনতার গণভোট আয়োজনের অনুমতি দেয়া হয়েছিল। গণভোটের পর সেই অনুমতির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়।
২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যের ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ বা ব্রেক্সিট স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার দাবিকে নতুন গতি দেয়। কিন্তু ২০২২ সালে যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন, যুক্তরাজ্য সরকার ও পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়া স্বাধীনতার গণভোট আয়োজনের জন্য আইন প্রণয়নের ক্ষমতা স্কটিশ পার্লামেন্টের নেই।
ওয়েলসে স্বাধীনতা বা সাংবিধানিক অবস্থান নিয়ে গণভোটের কোনো বিধিবদ্ধ ব্যবস্থাই নেই। ফলে তিন অঞ্চলের নেতারা ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিলেও দাবি বাস্তবায়নের পদক্ষেপ ও সময়সূচিতে সমন্বয় করা কঠিন হবে।
জনসমর্থনের দিক থেকেও অঞ্চলগুলোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন স্কটল্যান্ডের তুলনায় কম।
ওয়েলসের অর্থনীতি তুলনামূলক ছোট এবং অঞ্চলটি যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থায়নের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওয়েলসের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন কিছুটা বেড়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমেও ওয়েলশ ভাষার ব্যবহার বাড়ছে। তবে এ প্রবণতা এখনো মূলত সাংস্কৃতিক পর্যায়ে রয়েছে; যুক্তরাজ্য থেকে রাজনৈতিক বিচ্ছেদের পক্ষে মূলধারার জনসমর্থনে পরিণত হয়নি।
উত্তর আয়ারল্যান্ডের জনগণ রাজনৈতিক ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে বিভক্ত। ফলে যুক্তরাজ্য ত্যাগের পক্ষে সেখানে ঐকমত্য তৈরি করা কঠিন। স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন বাড়লেও এখনো তা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পৌঁছায়নি।
নিবন্ধটির লেখক তিয়েন দেওয়েন জানান, স্কটল্যান্ডসহ যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অংশে মাঠপর্যায়ে গবেষণার সময় তিনি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের অধিকাংশই স্থানীয় সংস্কৃতি রক্ষা, আঞ্চলিক অর্থনীতির উন্নয়ন এবং জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষার কথা বলেছেন।
তিন অঞ্চলে স্বাধীনতাপন্থি দল ক্ষমতায় আসার পেছনে রাজনৈতিক পরিস্থিতিরও ভূমিকা রয়েছে। এটি যুক্তরাজ্যের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি স্থানীয় ভোটারদের বাড়তে থাকা অসন্তোষের প্রতিফলন হতে পারে। বিকল্প দলকে ভোট দেয়ার অর্থ এই নয় যে সংশ্লিষ্ট ভোটাররা সবাই যুক্তরাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পক্ষে।
তারপরও তিনটি আঞ্চলিক সরকার একযোগে স্বাধীনতার গণভোটের অধিকার দাবি করায় যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট সামনে এসেছে। দেশটির রাজনৈতিক কাঠামোতেও পরিবর্তনের চাপ বাড়ছে। যুক্তরাজ্যের ওয়েস্টমিনস্টার যুগের অবসান হচ্ছে কি না, তা এখনই নিশ্চিত নয়; তবে বর্তমান পরিস্থিতি কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য সতর্কসংকেত।
—গ্লোবাল টাইমস প্রতিবেদনে অবলম্বনে





