ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করা হবে কি না, তা নিয়ে বর্তমানে চিন্তাভাবনা করছেন ট্রাম্প। মার্কিন কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, বিষয়টি এখনো বিবেচনাধীন। ঠিক এমন সময়ে ভ্যান্সের এই নজিরবিহীন মন্তব্য ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
একই সঙ্গে ভ্যান্সের এই অবস্থানে পেন্টাগনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, বিশেষ করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে নিয়ে। ট্রাম্প এর আগে হেগসেথকে এই যুদ্ধের শুরুর দিকের অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। কংগ্রেস সদস্যদের তীব্র সমালোচনার মুখেও পড়েছেন হেগসেথ।
এক্সে দেয়া পোস্টে ভ্যান্স লেখেন, ‘আমাদের পরাজয়ের কারণ হলো এই যুদ্ধ। আপনারা যদি তর্ক করতে চান যে এর সার্থকতা ছিল, আগামী ৬ বছরের জন্য সিনেট হারানোটা সার্থক ছিল, তবে তা করতে পারেন।’ ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অন্যতম প্রধান সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত ভ্যান্স আরও বলেন, যুদ্ধ বন্ধ করার বিষয়ে আগে যে সুপারিশ করা হয়েছিল, তা ছিল ‘সঠিক পরামর্শ’।
ভ্যান্সের এই মন্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, তিনি মনে করেন মন্তব্যগুলো ভালো ছিল। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি জানি এ বিষয়ে সে কেমন অনুভব করে।’ তবে পরক্ষণেই যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা তাদের পরমাণু অস্ত্র পাওয়া ঠেকিয়েছি।’
হোয়াইট হাউসের একজন উপদেষ্টা রয়টার্সকে জানান, ভেতরের কিছু কর্মকর্তা ও কর্মী ভ্যান্সের এই পোস্টকে প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে যাওয়া এবং যুদ্ধের কারণে দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ার প্রকাশ্য স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন।
মঙ্গলবারের নির্বাচনে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—উভয় কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রিপাবলিকানদের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসনগুলোতেও বড় জয় পেয়েছে তারা। মাত্র দুই বছর আগে যেসব রক্ষণশীল এলাকার ভোটাররা ট্রাম্পকে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এনেছিলেন, তারা এবার ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। ইরান যুদ্ধ নিয়ে গভীর হতাশা, জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ এবং ট্রাম্পের দেশ পরিচালনার ধরনে ক্ষোভই এর মূল কারণ।
অবশ্য ট্রাম্পের সঙ্গে নিজের মতপার্থক্য কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছেন ভ্যান্স। তিনি বলেছেন, ইরান যুদ্ধের কারণেই যে মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয় হয়েছে, তা প্রেসিডেন্ট নিজেও স্বীকার করেছেন। তবে ট্রাম্প এ বিষয়ে অনেকটা সংযত সুরে বলেছেন, নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের বহু কারণের মধ্যে ইরান যুদ্ধ একটি। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি সঠিক কাজই করেছি। আমি আবারও তা করতাম।’
এদিকে ২০২৮ সালের নির্বাচনে ভ্যান্সের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর থেকে নীরব রয়েছেন। এ প্রতিবেদনের বিষয়ে হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে তারা বুধবারের শুরুতে দেয়া ট্রাম্পের বক্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করেছে, যেখানে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধ একটি বড় কারণ ছিল বলে ভ্যান্সের মূল্যায়নের সঙ্গে একমত পোষণ করেছিলেন তিনি।
গত ফেব্রুয়ারিতে ইসরাইলের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন ট্রাম্প। সে সময় ইরান সরকারকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের মাস্তান’ আখ্যা দিয়ে তিনি পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যে সংক্ষিপ্ত এক সংঘাতের মাধ্যমেই এই সরকারের পতন ঘটবে। ওই হামলায় ইরানের সামরিক বাহিনী ও মাটির নিচে থাকা অস্ত্রের গুদামগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর কোনো শান্তিচুক্তি না হওয়ায় সংঘাতটি কার্যত অচলাবস্থায় রূপ নেয়। এরপর থেকে মাটির নিচে চাপা পড়া কিছু অস্ত্র উদ্ধার করেছে ইরান এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হুমকি দিচ্ছে, যা বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র জানিয়েছে, সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার কোনো স্পষ্ট পথ না থাকায় পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করার বিকল্পগুলো নিয়ে গত সপ্তাহে ট্রাম্পকে ব্রিফ করেন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। তবে একজন মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং গোয়েন্দা তথ্যের বিষয়ে অবগত আরও দুই মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোর গোয়েন্দা মূল্যায়নে দেখা গেছে যে ইরানে নতুন করে হামলা চালালেও আলোচনায় তেহরানের অবস্থানে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসবে না কিংবা সরকার পরিবর্তনও ঘটবে না।
তারপরও আলোচনার বিষয়ে অবগত সূত্রগুলো সতর্ক করে বলেছে, ট্রাম্প এখনো হামলার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তাদের মতে, মঙ্গলবারের নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক ঝুঁকির বিষয়টি জানতেন ট্রাম্প, কিন্তু তিনি ‘আসলে এর তোয়াক্কা করেননি’।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সূত্র বলেছে, মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হয়ে যাওয়ায় রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের আর হারানোর কিছু নেই এবং তিনি ইরানের ওপর আরও কঠোর হয়ে হামলা চালানোর দিকেই বেশি ঝুঁকতে পারেন। দ্বিতীয় একটি সূত্রও নতুন করে যুদ্ধ শুরুর প্রবল সম্ভাবনার বিষয়ে একমত পোষণ করে বলেছে, ‘তিনি ইরানে বোমা হামলার পরিকল্পনা করছেন। তিনি মুখে কী বলছেন, তা শুনবেন না। মধ্যবর্তী নির্বাচনের কারণে তিনি এত দিন তা স্থগিত রেখেছিলেন। মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত হামলা স্থগিত রাখতে আমরাই তাকে অনুরোধ করেছিলাম।’
বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন ব্যক্তি বলেছেন, ভ্যান্সের এই মন্তব্যকে তার ২০২৮ সালের নির্বাচনি প্রচারের শুরু হিসেবে দেখা যেতে পারে। ভ্যান্স এক্সে পোস্ট দেয়ার আগে হোয়াইট হাউসের কিছু কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। তবে হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে বলেন, হোয়াইট হাউসের প্রায় সব জ্যেষ্ঠ কর্মীই এই পোস্ট দেখে হতবাক হয়ে গেছেন।
নির্বাচনের পর যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে এমন আশঙ্কায় মধ্যস্থতাকারীরা যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টা জোরদার করেছেন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তেহরানের সঙ্গে আলোচনার ওপর বেশি জোর দিয়েছেন ভ্যান্স। তবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা শূন্যে নামিয়ে আনাসহ মার্কিন দাবিগুলো মেনে নেয়ার বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
—রয়টার্সের প্রতিবেদনে অবলম্বনে





