মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়ের পর ২০২৮-এর দৌড়; প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর আলোচনায় এগিয়ে যারা

ডেমোক্রেটিক পার্টির শীর্ষস্থানীয় মার্কিন রাজনীতিকেরা
বিদেশে এখন
0

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ‘নীল ঝড়’ বা ব্লু ওয়েভের ওপর ভর করে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেট উভয় কক্ষেরই নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের এই মধ্যবর্তী নির্বাচন কার্যত তার নীতি ও শাসনের ওপর এক ধরনের গণভোট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। সেখানে ভোটারদের এই স্পষ্ট রায়ের পর এখন সবার নজর ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে। শক্তি ফিরে পাওয়া ডেমোক্র্যাট দল থেকে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কে হবেন, তা নিয়ে এখন থেকেই শুরু হয়েছে জোর হিসাব-নিকাশ।

আগামী বছর থেকে শুরু হতে যাওয়া ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক বা প্রাইমারি নির্বাচনকে সামনে রেখে বেশ কয়েকজন নেতার নাম সামনে আসছে। এই তালিকায় আপাতত শীর্ষ বাজি না হলেও মিশিগান থেকে সেনেটর নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছেন আবদুল এল-সায়েদ। দেশটির ইতিহাসে তিনিই প্রথম মুসলিম সেনেটর। ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধের কড়া সমালোচনা এবং কট্টর বামপন্থি অবস্থান নিয়ে তিনি নজর কাড়লেও দলের মধ্যপন্থিদের কিছুটা দুশ্চিন্তায় ফেলেছেন।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট দৌড়ে যেসব ডেমোক্র্যাট নেতার অবস্থান শক্তিশালী হচ্ছে, তারা হলে—

জন ওসফ

জর্জিয়া থেকে ৫৯ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে সেনেটর পদে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ৩৯ বছর বয়সী জন ওসফ। দলের ভেতর তিনি এখন এক উদীয়মান তারকা। প্রেডিকশন মার্কেট প্ল্যাটফর্ম পলিমার্কেটের তথ্য অনুযায়ী, ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট মনোনয়ন জয়ের দৌড়ে তার সম্ভাবনা ২৪ শতাংশ। নির্বাচনে এই জয়ের পর সাম্প্রতিক ঘণ্টায় তার গ্রহণযোগ্যতা ৯ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি ও মেয়াদের সরাসরি কড়া সমালোচনা করে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন ওসফ। মঙ্গলবারের জয়ের পর দেয়া ভাষণে ট্রাম্পকে তিনি ‘অকার্যকর ও ক্ষমতা হস্তান্তরের অপেক্ষায় থাকা প্রেসিডেন্ট’ (লেমে ডাক) বলে অভিহিত করেন। অনেকে তার সঙ্গে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার তুলনা করছেন। প্রবীণ নেতাদের ভিড়ে তরুণ এই নেতা প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থি—উভয় শিবিরের কাছেই গ্রহণযোগ্য।

সমর্থকদের উদ্দেশে ওসফ বলেন, ‘আমরা সবাই মিলে এটিই নিশ্চিত করেছি যে আমাদের কাজ কেবল একজন প্রেসিডেন্টের অপকর্ম আটকে রাখা নয়, বরং ভেতরের ভাঙন মেরামত করা। আমেরিকার জনগণ অকার্যকর ও ক্ষমতা হস্তান্তরের অপেক্ষায় থাকা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে ট্রাম্পের ভ্রষ্টতা, দুর্নীতি ও ব্যর্থতাকে প্রত্যাখ্যান করেছে।’

পলিমার্কেটের হিসাবে, পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার দৌড়ে ওসফ এখন ১৮ শতাংশ সম্ভাবনা নিয়ে শীর্ষে আছেন। তিনি অ্যালেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কোরতেজের চেয়ে ৪ পয়েন্ট এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের চেয়ে ৫ পয়েন্ট এগিয়ে।

অ্যালেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কোরতেজ

নিউ ইয়র্কের ১৪ নম্বর কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে বিপুল ভোটে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন অ্যালেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কোরতেজ, যিনি এওসি নামেই বেশি পরিচিত। ৯৬ শতাংশ ভোট গণনা পর্যন্ত তিনি ৭৮ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছেন। এই ফলাফলের পর পলিমার্কেটে তার জয়ের সম্ভাবনা ২ পয়েন্ট বেড়ে ১৮ শতাংশে পৌঁছেছে।

৩৭ বছর বয়সী এই বামপন্থি ডেমোক্র্যাট নেতা ২০১৮ সালে প্রথম প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। প্রায় তিন মাস আগে এবিসির দিস উইক অনুষ্ঠানে দেয়া সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা নাকচ না করার পর আগস্টে তার জয়ের সম্ভাবনা ২৩ শতাংশে উঠেছিল।

গ্যাভিন নিউসাম

ক্যালিফোর্নিয়ার ৪০তম গভর্নর গ্যাভিন নিউসাম গত এক বছর ধরে আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন। ক্যালিফোর্নিয়ার রাজনীতির ৫৯ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ নেতা কয়েক মাস ধরে পূর্বাভাসে বেশ এগিয়ে ছিলেন। গত বছরের নভেম্বরে তার দলের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশে দাঁড়িয়েছিল।

তবে এরপর তার জনপ্রিয়তা কিছুটা কমেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালে ট্রাম্প পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পরপরই বিকল্প হিসেবে তাকে ভাবা হচ্ছিল। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সব বড় হাতের অক্ষরে বানান ভুলসহ ট্রাম্পকে ব্যঙ্গ করে পোস্ট দেয়ার কারণেও তিনি আলোচনায় এসেছিলেন। ক্যালিফোর্নিয়ায় দুই মেয়াদের বেশি গভর্নর থাকার নিয়ম না থাকায় এই নির্বাচনের পর তার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। আগামী নির্বাচনে দাঁড়াবেন কি না, সে বিষয়ে সন্তানদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে বলে গত সেপ্টেম্বরে জানিয়েছেন নিউসাম।

পিট বুটিজেজ

সাবেক নৌবাহিনী কর্মকর্তা ও জো বাইডেন প্রশাসনের পরিবহন মন্ত্রী পিট বুটিজেজ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় রয়েছেন। ২০২০ সালের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। সেই দৌড়ে সফল হলে তিনি হতেন যুক্তরাষ্ট্রের কনিষ্ঠতম ও প্রথম উন্মুক্ত সমকামী প্রেসিডেন্ট।

সাউথ ক্যারোলাইনার প্রাইমারিতে চতুর্থ হওয়ার পর ২০২০ সালের মার্চের শুরুতে দৌড় থেকে সরে দাঁড়িয়ে বাইডেনকে সমর্থন দেন তিনি। পলিমার্কেটে তার মনোনয়ন পাওয়ার বর্তমান সম্ভাবনা ৪ শতাংশ, যা এক বছর আগের ১৩ শতাংশ থেকে কমেছে। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতা ঘোষণা না করলেও এই সম্ভাবনা একেবারেই উড়িয়ে দেননি।

কামলা হ্যারিস

২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী কামলা হ্যারিস দ্বিতীয়বারের মতো চেষ্টা চালাতে পারেন। বাইডেন প্রশাসনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা হ্যারিস নির্বাচনের সময় কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়েছিলেন, যখন বাইডেন প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ালে তিনি প্রার্থিতা পান।

১৯৬৮ সালের পর তিনিই প্রথম প্রার্থী, যিনি কোনো প্রাইমারিতে অংশ না নিয়েই সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়েন। মাত্র ১০৭ দিনের এই প্রচার ছিল মার্কিন ইতিহাসের সংক্ষিপ্ততম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনি প্রচার। তবে ভোটারদের মন জয় করতে না পারা এবং বাইডেন প্রশাসনের আমলের দায় থেকে নিজেকে সরাতে না পারার কারণে তিনি পরাজিত হন। হ্যারিস ২০২৮ সালের দৌড়ে অংশ নেয়ার বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না বললেও কিংবা উড়িয়ে না দিলেও অনেক বিশেষজ্ঞের ধারণা, তিনি আবার ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

এএম