প্রকৃতপক্ষে সেটি কোনো কাপড়ের কারখানা ছিল না, গড়ে তোলা হচ্ছিল বহুল আলোচিত দিমোনা পরমাণু চুল্লি—যা আজ মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত। সেই ঘটনার পর ছয় দশক পার হয়ে গেছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিব আজ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি যে ইসরাইলের কাছে পারমাণবিক বোমা রয়েছে। দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে এই ‘কৌশলগত অস্পষ্টতা’ বজায় রাখলেও বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন যুদ্ধ এবং পরিবর্তিত ভূরাজনীতি সেই দীর্ঘ লুকোচুরিকে নজিরবিহীন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
ইসরাইলের এই কর্মসূচি নিয়ে বিশ্বজুড়ে দীর্ঘদিনের এক নীরব কূটনীতি চালু রয়েছে। ১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়ার একটি ইউরেনিয়াম কারখানা থেকে শত শত পাউন্ড অস্ত্র তৈরির উপযোগী ইউরেনিয়াম উধাও হয়ে যায়, যা ইসরাইলে পাচার হয়েছিল বলে পরবর্তীতে তদন্তে উঠে আসে। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ারের মধ্যে এক অলিখিত সমঝোতা হয়। এতে ঠিক হয়, ইসরাইল প্রকাশ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালাবে না বা ঘোষণা দেবে না, আর যুক্তরাষ্ট্রও তাদের ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করবে না। এভাবেই বিশ্বজুড়ে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে (এনপিটি) স্বাক্ষর না করেও পারমাণবিক পরাশক্তি হয়ে ওঠে ইসরাইল।
১৯৮৬ সালে দিমোনা পরমাণু কেন্দ্রের সাবেক টেকনিশিয়ান মোর্দেচাই ভানুনু লন্ডনের দ্য সানডে টাইমস পত্রিকায় ভেতরের ছবি ও গোপন নথি ফাঁস করে দিলে ইসরাইলের পারমাণবিক সক্ষমতার বিষয়টি চূড়ান্তভাবে বিশ্ববাসীর সামনে আসে। এরপর ভানুনুকে রোম থেকে ফাঁদ পেতে অপহরণ করে নিয়ে যায় ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং ১৮ বছর তাকে ইসরাইলের কারাগারে কাটাতে হয়। অস্ত্র পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের তথ্যমতে, ইসরাইলের হাতে বর্তমানে প্রায় ৯০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে।
স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে আরব দেশগুলোকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের প্রতিযোগিতা থেকে দূরে রাখা এবং ইসরাইলকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা থেকে বাঁচাতে এই গোপনীয়তার নীতি বেশ কাজে দিয়েছিল। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই পুরোনো নীতি বজায় রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ চলছে। তেহরানের পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা এবং বিপরীতে সৌদি আরবের নিজস্ব পারমাণবিক প্রযুক্তি অর্জনের দৌড় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অস্ত্রের প্রতিযোগিতা উসকে দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ইসরাইলের এই নীতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। মার্কিন কংগ্রেসের প্রভাবশালী ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি জোয়াকিন কাস্ত্রো সিএনএনকে বলেন, ইসরাইলের পারমাণবিক সক্ষমতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই অস্পষ্টতা বজায় রাখার নীতি এখন ‘উদ্বেগজনক ও বিপজ্জনক’ হয়ে উঠেছে। তার মতে, ইসরাইলের সঙ্গে মিলে যুদ্ধ করার সময় তারা কখন এবং কোন পরিস্থিতিতে এই গণবিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহারের চূড়ান্ত সীমা (রেড লাইন) নির্ধারণ করেছে, তা মার্কিন নীতিপ্রণেতাদের জানা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
এমনকি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সম্প্রতি এক শুনানিতে স্বীকার করেছেন, ‘বিশ্বের বেশির ভাগ মানুষই বিশ্বাস করে তাদের (ইসরাইলের) পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে, তবে প্রকাশ্যে তারা কখনোই তা স্বীকার করেনি।’ অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইসরাইলকে দেওয়া বার্ষিক প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা ওয়াশিংটন বন্ধ করে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসরাইল যদি নিজেদের পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যাপক বিস্তার ঘটাবে। আবার এই সত্য অস্বীকার করে রাখলেও বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কৌশলগত ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি অনেক গুণ বেড়ে যায়। ছয় দশকের পুরনো ‘টেক্সটাইল কারখানা’র গল্প তাই ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের জন্য এক নতুন ভূরাজনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে।
—সিএনএনের প্রতিবেদনে অবলম্বনে





