দীর্ঘ অপেক্ষা, মিনিট পেরিয়ে ঘণ্টা, দিনে কিংবা রাতে— কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি তেল পেতে লম্বা সারির এমন দৃশ্য এখন রোজকার। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে দেশে হঠাৎ-ই তৈরি হয় জ্বালানি সংকট। এতে চাপ সামলাতে হিমশিম অবস্থা পাম্প মালিকদের।
বাস্তবতা বলছে, অকটেন-পেট্রোলের চাহিদার একটি বড় অংশ দেশের গ্যাস ফিল্ড থেকে উৎপাদিত হয়। তারপরও কেন সরবরাহ সংকট?
এমন বাস্তবতায়, সিলেট গ্যাসফিল্ড লিমিটেড কর্তৃপক্ষ জানায়, গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে গ্যাসের সঙ্গে যে কনডেনসেট পাওয়া যায়, তা প্রক্রিয়াজাত করে পেট্রোল ও অকটেনের চাহিদার একটি বড় অংশের যোগান মেলে।
কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করতে হবিগঞ্জে দুটি বিপিডি কনডেনসেট ফ্র্যাকশনেশন প্লান্ট থেকে প্রতিদিন ৪ হাজার ৫০০ ব্যারেল কনডেনসেট থেকে ৩ হাজার ৪৫০ ব্যারেল অকটেন, ৬০০ থেকে ৭০০ ব্যারেল পেট্রোল, দেড়শো ব্যারেল ডিজেল, ১০০ ব্যারেল কেরোসিন এবং ১৭ ব্যারেল এলপিজি সরবরাহ করা হচ্ছে। যা দেশে অকটেনের মোট চাহিদার ৭ থেকে ৮ শতাংশ, পেট্রোলের ৩৩ থেকে ৩৫ শতাংশ এবং কেরোসিনের চাহিদার ৭ শতাংশ।
সিলেট গ্যাসফিল্ড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. ফারুক হোসেন বলেন, ‘আমি যদি ব্যারেলের হিসেবে বলি, তাহলে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ৪৫০ ব্যারেল পেট্রোল করতে পারি; আর ৬০০ থেকে ৭০০ ব্যারেল অকটেন করতে পারি। এছাড়া আমাদের সামান্য ডিজেল হয়, সেটা ১৫০ ব্যারেলের মতো প্রতিদিন। সম্প্রতি দেশে যে জ্বালানি সংকট, এই মুহূর্তে আমাদের যতক্ষণ প্রোডাক্ট থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা এটা সরবরাহ দেবো, সেটা যেকোনো দিন, এমনকি বন্ধের দিনেও।’
পরিসংখ্যান বলছে, পেট্রোলের চাহিদার পুরোটাই দেশে উৎপাদিত হলেও অকটেনের ৫০ শতাংশ আমদানি করতে হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে অকটেনের চাহিদা ছিল ৪ লাখ ১৫ হাজার টন। তার বিপরীতে আমদানি হয় ২ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩০ টন।
আর দেশিয় কনডেনসেট থেকে উৎপাদন করা হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার ১৭০ টন। আর পেট্রোলের চাহিদার প্রায় ১৬ শতাংশ আসে ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে বাকি অংশের যোগান দেয় বেসরকারি শোধনাগারগুলো।
পেট্রোল পাম্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের দাবি অনুযায়ী পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও মাত্র ৪ থেকে ৫ ঘণ্টাতেই ফুরিয়ে যাচ্ছে তেল। এজন্য প্যানিক বায়িংকেই দুষছেন তারা।
আরও পড়ুন:
এক পাম্প ম্যানেজার জানান, তারা সরবরাহ বাড়াতে চেষ্টা করছেন। তবে সরবরাহ বাড়লেও জনগণের আতঙ্ক কমানো যাচ্ছে না বলে দাবি তার।
অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে চাহিদার একটি বড় অংশের যোগান এলেও জ্বালানি সরবরাহে কেন এত চাপ? এমন প্রশ্নে বিপিসি চেয়ারম্যান জানান, সাপ্লাই চেইন ঠিক রাখতে গড় বরাদ্দ হিসেবে প্রতিটি পাম্পেই পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ হচ্ছে। তবে অতিরিক্ত চাহিদা চাপ বাড়াচ্ছে।
বিপিসি চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান বলেন, ‘এ পর্যন্ত আমাদের সাপ্লাই চেইনের মধ্যে কোনো ডিস্টার্বেন্স পাইনি। এরপর আমরা অতিরিক্ত আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি, এর সফলতার জন্য আমরা অপেক্ষা করছি।’
পেট্রোল পাম্পের লাইন কমছে না কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা তো জনগণই বলছে যে, একই ব্যক্তি বারবার আসছেন ঘুরে ফিরে। এ বিষয়ে আমাদের আরেকটু কাজ করার ব্যাপার আছে।’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাস অনুসন্ধানে পিছিয়ে থাকায় বর্তমান মজুত থেকে অতিরিক্ত উৎপাদনে সাফলতা আসছে না। গ্যাসফিল্ড থেকে অকটেন-পেট্রোলের কাঁচামালের যোগান বাড়াতে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো ও কনডেনেসেটের পাশাপাশি ন্যাফথাকেও জ্বালানি উৎপাদনের কাজে ব্যবহারের পরামর্শ তাদের।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মকবুল-ই এলাহী চৌধুরী বলেন, ‘আজকে কিন্তু গ্যাস ক্ষেত্রগুলোর প্রোডাকশন নেমে গেছে। বিশেষ করে বিবিয়ানা, কৈলাশ টিলা, বিরানিবাজার— এগুলো থেকেই কনডেনসেট বেশি। কনডেনসেট প্রোডাকশনের যে হার, সেটাও কিন্তু ড্রাস্টিক্যালি কমে আসছে। এরপরও যতটুকু ক্যু আছে, সেটা রিফাইন হচ্ছে; আমাদের তিন-চারটা প্রাইভেট কোম্পানি করছে। তবে আমরা যতই আনি, যদি চুরির রাস্তা রেখে দেই, তাহলে কি আপনি চলতে পারবেন? সম্ভব নয়। রাজার ভান্ডারও শেষ হয়ে যাবে।’
আরেক বিশেষজ্ঞ ড. ম. তামিম বলেন, ‘আমাদের গ্যাসফিল্ড থেকে মূলত পেট্রোল আসে। অকটেন নাম্বারের ওপর এ পেট্রোলের কোয়ালিটি নির্ভর করে। আমাদের যে অক্টেনটা বিক্রি হয়, এটা ৯২ থেকে ৯৫ অকটেন নাম্বার। আর পেট্রোলটা ৮২ থেকে ৮৫ অকটেন নাম্বারে বিক্রি হয়। ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে যে পেট্রোলটা বের হয়, এটার অক্টেন নাম্বার আবার বেশি। তাই কনডেনসেট এবং এটা মিলিয়ে এটা ৮২ অকটেন নাম্বারে বিক্রি করি।’
শুধু বিদেশ নির্ভর না হয়ে দেশের জ্বালানি খাতকে সমৃদ্ধ করতে জ্বালানি নীতির বাস্তবায়ন করাসহ দেশিয় উৎপাদনের দিকে নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ বিশেষজ্ঞদের।





