কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানের ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলোর সুড়ঙ্গমুখ ও যাতায়াতের পথগুলো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এতে এসব ঘাঁটিতে ইরানের প্রবেশাধিকার অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়ে। তবে সিএনএনের বিশ্লেষণ করা স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, বুলডোজার ও ডাম্প ট্রাকের মতো সাধারণ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেই তেহরান এই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ মোকাবিলা করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে কেবল সুড়ঙ্গমুখ ধ্বংস করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুরোপুরি শেষ করা সম্ভব নয়।
হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক চুক্তিতে পৌঁছালেও এর বিস্তারিত চূড়ান্ত করতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের গবেষক ও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বিশ্লেষক স্যাম লেয়ার বলেন, ‘যুদ্ধ যদি আবার শুরু হয়, তবে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও লঞ্চার ও জনবল থাকা সাপেক্ষে ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যেতে পারবে। বিপুল পরিমাণ যে মজুত এখনো তাদের কাছে রয়েছে, তা দিয়ে লঞ্চারগুলো পুনরায় সজ্জিত করতে কোনো বাধা নেই।’
যুদ্ধ চলাকালেও চরম ঝুঁকির মুখে সুড়ঙ্গমুখগুলো খনন করার চেষ্টা করেছিল ইরান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল সে সময় খননকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিতেও আঘাত হেনেছে। তবে কয়েক সপ্তাহ আগে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর থেকে এই ঘাঁটিগুলো সচল করার কাজ ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে তেহরান। সিএনএনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ১৮টি ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনার ৬৯টি সুড়ঙ্গমুখ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এর মধ্যে অন্তত ৫০টি সুড়ঙ্গমুখ ইতিমধ্যে পরিষ্কার করেছে ইরান। বোমাবর্ষণে ধ্বংস হওয়া যাতায়াতের পথগুলোও মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে।
বিশ্লেষক স্যাম লেয়ার বলেন, ‘কৌশলগত সফলতা অর্জনে মার্কিন সামরিক বাহিনী অত্যন্ত দক্ষ। তবে যৌক্তিক কৌশলগত লক্ষ্য ও বিজয়ের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকলে শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে পারে।’
আরও পড়ুন:
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল সিএনএনের এই তথ্যের বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে আগের একটি বিবৃতির পুনরাবৃত্তি করে তিনি বলেন, ‘মার্কিন সামরিক বাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং প্রেসিডেন্টের নির্দেশিত যেকোনো স্থানে অভিযান চালানোর মতো সক্ষমতা তাদের রয়েছে।’
ইরানের এই ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারকে যুদ্ধের অন্যতম কারণ হিসেবে বারবার উল্লেখ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত মার্চে ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে তিনি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করাকে এই যুদ্ধের অন্যতম ‘লক্ষ্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।
২০ বছরের বেশি সময় ধরে তৈরি করা ইরানের এই ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিগুলো অনেক বেশি সুরক্ষিত। এর কয়েকটি শত শত মিটার গভীরে অবস্থিত হওয়ায় মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনীর হামলার বিকল্পও বেশ সীমিত। তাই সংঘাতের শুরুর দিকে তারা কেবল ঘাঁটির সুড়ঙ্গমুখ এবং লঞ্চারগুলো ধ্বংস করার দিকে মনোযোগ দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও সরবরাহের নেটওয়ার্ক ধ্বংস করার ব্যাপক চেষ্টাও চালিয়েছে। গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেছিলেন, ‘ইরানের এখন আর কোনো প্রতিরক্ষা শিল্প নেই।’
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভূগর্ভস্থ ঘাঁটিগুলোতে এখনো প্রায় এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র মজুত রেখেছে ইরান। মাটির অনেক গভীরে থাকায় এগুলো হামলায় তেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক তিমুর কাদিশেভ বলেন, ‘তারা ২০ বছর ধরে এ ধরনের একটি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তারা বেশ ভালোভাবে প্রস্তুত।’
ইরান দ্রুত তাদের সক্ষমতা ফিরে পাওয়ায় বিশ্লেষকেরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মার্কিন গোয়েন্দাদের মূল্যায়নেও দেখা গেছে যে, ড্রোন উৎপাদন ও ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার প্রতিস্থাপনসহ মূল সামরিক সক্ষমতাগুলো দ্রুত পুনর্গঠন করছে তেহরান। এক মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, ‘আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ইরানের সক্ষমতা ফিরে পাওয়ার যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল, তারা তার চেয়েও দ্রুত কাজ করছে।’
গবেষক কাদিশেভ বলেন, ‘এই ধরনের ক্ষতি করতে অত্যন্ত অত্যাধুনিক ও দামি অস্ত্র ব্যবহার করতে হয়, অথচ এগুলো ঠিক করতে প্রয়োজন হয় কেবল বুলডোজারের মতো সাধারণ প্রযুক্তি।’





