গণবিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স; চাপে ম্যাক্রোঁ সরকার

বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স
বিদেশে এখন
1

লাখ লাখ জনতার তুমুল বিক্ষোভ উত্তাল হয়ে উঠেছে ফ্রান্স। মজুরি বৃদ্ধিসহ শিক্ষাখাতের সংস্কার দাবিতে। এতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র পাঁচ মাস আগে চাপে পড়েছে ম্যাক্রোঁ সরকার। পরিস্থিতি সামলাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনসহ বিভিন্ন শহরে জারি করা হয়েছে কারফিউ।

সম্প্রতি দেশটিতে , বিভিন্ন দাবিতে বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ হয়েছে। যাতে অংশ নিয়েছে লাখ লাখ মানুষ। বামপন্থী সিজিটিসহ বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের ডাকে, ছাত্র সংগঠনগুলোর সমর্থনে দেশব্যাপী এ বিক্ষোভ শুরু হয়। সঙ্গে চলছে সরকারি কর্মীদের ধর্মঘট। এ অস্থিরতা সামাল দিতে বিপাকে ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশজুড়ে প্রায় এক লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন ছাড়াও বিভিন্ন শহরে জারি করা হয়েছে কারফিউ।

‘স্বাধীনতা জনগণকে পথ দেখায়।’ ১৮৩০ সালের ফরাসি বিপ্লবের পটভূমিতে আঁকা ফরাসি চিত্রশিল্পী ইউজিন দেলাক্রোয়ার বিশ্বখ্যাত চিত্রকর্ম। যা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের অধিকার আদায় ও অন্যায়ের প্রতিবাদের ভাষা খুঁজে পেয়েছেন ফ্রান্সে চলমান গণবিক্ষোভে অংশ নেয়া প্রতিবাদকারীরা।

বৃহস্পতিবার এসব বার্তাবাহী প্ল্যাকার্ড হাতে ফরাসি প্রজাতন্ত্রের রূপক মারিয়ানের ভাস্কর্যের চারপাশে জড়ো হয়ে স্লোগান দেন বিক্ষোভকারীরা। মজুরি বৃদ্ধি, শিক্ষাখাতের সংস্কারসহ বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ দেশটির লাখ লাখ মানুষের। ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশজুড়ে এ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন প্রায় ছয় লাখ মানুষ, অন্যদিকে অন্যতম আয়োজক সিজিটি ইউনিয়নের দাবি, এতে মানুষ অংশ নিয়েছে ১৬ লাখ।

বিক্ষোভকারীদের একজন বলেন, ‘আন্দোলন শুরু করার জন্য আমরা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাহসিকতা নিয়ে গর্বিত। যার জন্য সব শ্রমিক অপেক্ষা করছিল। যাতে একটি সাধারণ ধর্মঘট শুরু হতে পারে। যেন যারা চাকরির বেতন দিয়ে আর সংসার চালাতে পারছে না, সরকার সেসব মানুষের কথা শোনে। আজ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলছে, তাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। সরকারকে জেগে উঠতে হবে।’

অন্য আরেকজন বলেন, ‘যদি সাধারণ ধর্মঘট হয়,সবাই তাতে অংশ নেয়, তাহলে তা সরকারকে পিছু হটতে বাধ্য করতে পারে। সেটি সরকারকে জনগণের ক্ষোভ শুনতে বাধ্য করবে। যতক্ষণ না আমরা এ পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছি, আমাদের কথা শোনানো কঠিন হবে।

আরও পড়ুন:

বামপন্থী সিজিটিসহ বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়নের ডাকে এবং ছাত্র সংগঠনগুলোর সমর্থনে দেশব্যাপী এ বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। সঙ্গে চলছে সরকারি কর্মীদের ধর্মঘট। দিনব্যাপী গণবিক্ষোভের শেষে রাতে প্যারিসের নেশন স্কোয়ারে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী সমবেত হন।

প্যারিসের বিক্ষোভে শুরুতে পরিবেশ ছিলো উৎসবমুখর। প্রথমদিকে অংশগ্রহণকারীরা 'লা মার্সেইয়েজ' গাইছিলেন। কিন্তু পরে একদল বিক্ষোভকারী পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ালে জবাবে কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে পুলিশ।

গেল সেপ্টেম্বরে শিক্ষা খাতের অব্যবস্থাপনা, বাজেট সংকট, শিক্ষক স্বল্পতার প্রতিবাদে প্যারিসের একটি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে আন্দোলনের সূত্রপাত। পরবর্তীতে এ আন্দোলন দেশজুড়ে একটি ব্যাপক গণবিক্ষোভ ও রাজনৈতিক সংকটে রূপ নেয়। এরপর নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী মূল্যবৃদ্ধির ক্ষোভ থেকে সরকারের অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হন সাধারণ পরিবারগুলো। পরবর্তীতে বড় বড় শ্রমিক ইউনিয়নগুলোও আন্দোলনে যোগ দেয়।

শান্তিপূর্ণ সমাবেশে পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের ফলে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়। এরপরই বিক্ষোভটি সহিংস দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের মতো পরিস্থিতিতে রূপ নেয়। অস্থিরতা সামাল দিতে দেশটির সরকার দেশজুড়ে প্রায় এক লাখ পুলিশ মোতায়েন ছাড়াও বিভিন্ন শহরে কারফিউ জারি করা হয়। সহিংসতা ও লুটপাটের জেরে কয়েক হাজার গ্রেপ্তারসহ আহত হন হাজারেরও বেশি পুলিশ সদস্য।

বিক্ষোভকারীরা বারবার বেতন বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের দাবি জানালেও সরকারের আর্থিক হাত বেশ সংকুচিত। দেশটির জিডিপির প্রায় ১২০ শতাংশ ছুঁয়ে যাওয়া বিপুল রাষ্ট্রীয় ঋণ ও ২০২৭ সালের বাজেট নিয়ে টানাপোড়েনে ব্যয় কমানোর চরম চাপে বর্তমান সরকার। যা আন্দোলনকারীদের দাবি পূরণে বড় বাধা।

২০২৭ সালের এপ্রিল মাসে ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। তবে অংশ নিতে পারবেন না ম্যাক্রোঁ। এই রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও জনঅসন্তোষকে পুঁজি করে চরম ডানপন্থী নেত্রী মারিন লে পেন এবং বামপন্থী দলগুলো নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। যা ম্যাক্রোঁর মধ্যপন্থী উত্তরসূরিদের জন্য পরিস্থিতিকে করেছে আরও জটিল। তবে স্বাভাবিক পরিবেশে আগামী নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার রয়েছে ম্যাক্রোঁ সরকারের।

এফএস