নামের মিলে কারাগারে থাকা নিরপরাধ আলমাসকে মুক্তির নির্দেশ হাইকোর্টের

হাইকোর্ট
আইন ও আদালত
0

নামের মিলের কারণে গত এক বছর ধরে কারাগারে থাকা ঢাকার দোহার উপজেলার কুসুমহাটি ইউনিয়ন পরিষদের সুন্দরীপাড়া গ্রামের মো. আলমাস নামের এক ব্যক্তিকে মুক্তির নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আজ (রোববার, ৮ নভেম্বর) বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমেদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মহিউদ্দিন হানিফ এবং ভুক্তভোগী মো. আলমাসের পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট তানভীর আহমেদ।

এর আগে, হাইকোর্টে জমা হওয়া এক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, কেবল নামের মিল থাকায় দুই যুগ আগের একটি অস্ত্র মামলায় গত এক বছর ধরে কারাগারে আছেন মো. আলমাস।

মামলায় দণ্ডিত প্রকৃত আসামির নামও মো. আলমাছ। ঘটনার পরপরই তিনি পাড়ি জমান কানাডায়। তার স্থায়ী ঠিকানা দোহার উপজেলার নয়াবাড়ি ইউনিয়নের দক্ষিণ বাহ্রা ডাকঘরের অধীন পূর্ব ধোয়াইর গ্রামে। হাইকোর্টে জমা হওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে এমন তথ্য।

নামের মিলে প্রকৃত অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিবর্তে কারাগারে থাকা আলমাসকে গ্রেপ্তার করা হলে উচ্চ আদালতে রিট করেন তিনি। রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত ৬ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রুল জারি করে কারাগারে থাকা আলমাস ও দণ্ডিত ব্যক্তির পরিচয় ও বিস্তারিত তথ্য যাচাইয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন।

ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে তার তত্ত্বাবধানে একজন সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে তদন্ত পরিচালনা করতে বলা হয়। আদেশ পাওয়ার তারিখ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়। সেই আদেশ প্রতিপালন করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া গত বৃহস্পতিবার।

ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজুর রহমান দাখিল করা প্রতিবেদনে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়- গ্রেপ্তার হওয়া মো. আলমাস এবং মিরপুর থানায় ২০০২ সালের ১০ এপ্রিল দায়ের হওয়া ৩২ নম্বর মামলায় (ট্রাইব্যুনাল মামলা ৮০৪/২০০২, ধারা অস্ত্র আইন, ১৮৭৮ এর ১৯-ক) দণ্ডপ্রাপ্ত মো. আলমাছ দুজন সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তি।

এতে বলা হয়, গ্রেপ্তার হওয়া মো. আলমাস যার পিতা শেখ খলিল ও মাতা রশনারা বেগম ও হাইকোর্টে রিট আবেদনকারী একই ব্যক্তি। তিনি মিরপুর থানায় ২০০২ সালের ১০ এপ্রিল দায়ের হওয়া ৩২ নম্বর মামলায় (ট্রাইব্যুনাল মামলা ৮০৪/২০০২, ধারা অস্ত্র আইন, ১৮৭৮ এর ১৯-ক) সাজাপ্রাপ্ত আসামি নন।

পলাতক মো. আলমাছ যারা পিতা খলিলুর রহমান বা খলিল আহম্মেদ বা মো. আবুল খায়ের খলিল ও মাতা সালমা আক্তার ওই মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি। তিনি বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকৃত আসামি মো. আলমাছ ও গ্রেপ্তার হওয়া মো. আলমাসের পিতৃপরিচয় মেলে না। প্রকৃত আসামি মো. আলমাছের পিতা খলিলুর রহমান বা খলিল আহম্মেদ বা মো. আবুল খায়ের খলিল। আর জেলে থাকা মো. আলমাসের পিতা শেখ খলিল। দুজনের পিতামহও ভিন্ন। দুই পরিবারের ভাইবোনের তালিকায়ও একটি নামও মেলে না। প্রকৃত আসামি মো. আলমাছ তিন বোনের একমাত্র ভাই। আর গ্রেপ্তার হওয়া মো. আলমাসের আছে দুই ভাই ও দুই বোন।

এতে আরও বলা হয়, ২০০২ সালে সাজাপ্রাপ্ত মো. আলমাছের বয়স ছিলো ২৪। সেই হিসাবে ২০০৬ সালে তার বয়স হওয়ার কথা প্রায় ৪৮। অথচ গ্রেপ্তার হওয়া মো. আলমাসের জন্ম তারিখ ১০ ডিসেম্বর ১৯৮৫। সেই হিসাবে তার বর্তমান বয়স ৪১ বছর। অর্থাৎ ২০০২ সালে তিনি ছিলেন ১৭ বছরের। বয়সের ব্যবধান প্রায় ৭ বছরের। এটি উপেক্ষা করার মতো নয়।

ভুল ব্যক্তি গ্রেপ্তারের পেছনে তিনটি কারণ উল্লেখ করা হয় তদন্ত প্রতিবেদনে। প্রথমত- গ্রেপ্তার হওয়া মো. আলমাস সপরিবারে ২০০৭ সালের আগে দক্ষিণ বাহ্রা ডাকঘরের অধীন বাহ্রা গ্রামে বসবাস করতেন। অপরদিকে প্রকৃত আসামির গ্রাম পূর্ব ধোয়াইরও একই ডাকঘরের অধীন। ফলে ডাকঘরের নামে পরিচয় দেওয়ার প্রচলনের কারণে দুজনের ঠিকানা এক হয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত- উভয়ের পিতার নামে অনেকাংশে মিল ছিলো। প্রকৃত আসামির পিতার নাম খলিলুর রহমান বা খলিল আহম্মেদ বা মো. আবুল খায়ের খলিল। এই নামের সাদৃশ্য পরিচয় নির্ধারণে বিভ্রান্তি বাড়িয়েছে। তৃতীয়ত- ২০০২ সালে দায়েরকৃত অস্ত্র মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মো. আলমাছের ঠিকানা ভুলক্রমে ‘পূর্ব ধোয়াইর’ এর স্থলে ‘দক্ষিণ বাহ্রা’ লেখা হয়, যা পরবর্তীতে নথিতেও বহাল থাকে। মামলার রায় শেষে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাতেও আসামি মো. আলমাছের ঠিকানা পূর্ব ধোয়াইরের পরিবর্তে দক্ষিণ বাহ্রা হয়ে যায়।

মামলার নথি থেকে জানা যায়, মো. আলমাছ (২৪) ও মো. নাজমুল আলম মামুনের (২২) বিরুদ্ধে মিরপুর থানায় ২০০২ সালের ১০ এপ্রিল অস্ত্র আইনে মামলা করে পুলিশ। অস্ত্র আইনের ওই মামলায় ২০০৪ সালের ১৯ জুন ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১১ রায় দেন। রায়ে মো. আলমাছকে (বাবা মো. খলিল আহমেদ, গ্রাম- দক্ষিণ বাহ্রা, দোহার, ঢাকা) ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন। রায়ে আসামির বর্তমান ঠিকানা আহমেদনগর, পাইকপাড়া, মিরপুর উল্লেখ করা হয়েছিল। অপর আসামি নাজমুল খালাস পান।

রায় ঘোষণার সময় আলমাছ পলাতক ছিলেন। তার নামে সাজা পরোয়ানা ইস্যু করা হয়। ২০২৪ সালের ২০ মার্চের পরোয়ানার পরিপ্রেক্ষিতে আলমাসকে (বাবা শেখ খলিল) সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে গত বছরের ৫ নভেম্বর আদালতে হাজির করে পুলিশ। আদালত তাকে কারাগারে পাঠান। সেই থেকে তিনি কারাগারে আছেন।

এসএইচ