ডেমোক্র্যাটদের ‘কব্জায়’ কংগ্রেস; ট্রাম্পের সমস্যা কোথায়

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প
বিদেশে এখন
0

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান পার্টি। প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) ও সিনেট; কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণই পেয়েছে বিরোধীদল ডেমোক্র্যাটরা। ফলে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হতে যাচ্ছে বিভক্ত সরকারব্যবস্থা।

ডেমোক্র্যাটরা শুধু প্রচলিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতেই নয়, রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটিতেও জয় পেয়েছেন। টেক্সাস, কানসাস, সাউথ ক্যারোলাইনা, আইওয়া ও ওহাইওর মতো রাজ্যে সিনেটের আসন ছিনিয়ে নেয়া এই নির্বাচনের অন্যতম বড় ঘটনা। অন্যদিকে, প্রতিনিধি পরিষদেও ডেমোক্র্যাটরা উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন।

ভোটারদের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে অসন্তোষ রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ভোটারদের বড় একটি অংশ নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশের সুযোগ হিসেবে দেখেছেন এই মধ্যবর্তী নির্বাচনকে।

কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানো ট্রাম্পের জন্য কেন এত বড় ধাক্কা? ডেমোক্র্যাটরা এখন কোন কোন সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারবেন? আর এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতিতে কী পরিবর্তন আসতে পারে?

আরও পড়ুন:

ডেমোক্র্যাটদের হাতে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ যাওয়ার পর সবচেয়ে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন হতে পারে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক তদন্তের সুযোগ তৈরি হওয়া।

প্রতিনিধি পরিষদের বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় প্রশাসনের কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখার ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটরা বাড়তি ক্ষমতা পাবেন। ট্রাম্পের নীতিনির্ধারণ, সরকারি কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড, তার পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং জেফরি এপস্টিন-সংক্রান্ত তদন্তের নথি প্রকাশ ও ব্যবস্থাপনা; এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

কংগ্রেসের কমিটিগুলো সমন জারি করে সরকারি কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষ্য দিতে তলব করতে পারে। প্রয়োজনীয় নথিপত্র চাওয়া, প্রকাশ্য শুনানির আয়োজন এবং প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগও থাকবে।

বিশেষ করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, অভিবাসন কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড, সরকারি অর্থের ব্যবহার এবং প্রেসিডেন্টের পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থ নিয়ে তদন্ত ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে।

আরও পড়ুন:

তবে হোয়াইট হাউস নির্বাহী গোপনীয়তার যুক্তি তুলে ধরে কিছু তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ানোর সম্ভাবনাও রয়েছে।

অর্থাৎ, ডেমোক্র্যাটদের তদন্তের মুখোমুখি হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক ও জনমতের চাপ সামলাতে হতে পারে ট্রাম্প প্রশাসনকে।

ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে প্রতিনিধি পরিষদ চলে যাওয়ায় ট্রাম্পের অভিশংসনের উদ্যোগও নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে।

নিজের প্রথম মেয়াদে ২০১৯ ও ২০২১ সালে দুইবার অভিশংসিত হয়েছিলেন ট্রাম্প। প্রথমবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের ওপর রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের অভিযোগে এবং দ্বিতীয়বার ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হিলে হামলার ঘটনায় ভূমিকার কারণে তার বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাব আনা হয়েছিল। তবে দুইবারই সিনেটে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় তিনি দোষী সাব্যস্ত হননি।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদ সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসনের অভিযোগ অনুমোদন করতে পারে। এরপর সিনেটে বসে সেই অভিযোগের বিচার হয়। সেখানে উপস্থিত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন ছাড়া প্রেসিডেন্টকে দোষী সাব্যস্ত করে পদ থেকে সরানো সম্ভব নয়।

ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন পাওয়া কঠিন হবে। ফলে অভিশংসনের প্রস্তাব পাশ হলেও ট্রাম্পকে ক্ষমতা থেকে সরানো নিশ্চিত নয়।

তবে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হলে তা ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থানকে বড় ধরনের চাপে ফেলতে পারে। প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তের তথ্য, প্রকাশ্য শুনানি এবং অভিযোগগুলো তখন জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে চলে আসবে।

ট্রাম্পের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সিনেটের বিরোধিতার মুখে পড়া।

আরও পড়ুন:

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, মন্ত্রিসভার সদস্য, রাষ্ট্রদূত এবং সুপ্রিম কোর্টসহ ফেডারেল আদালতের বিচারকদের নিয়োগে সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন। ফলে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় ট্রাম্পের মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়োগপ্রক্রিয়া আটকে দেয়া, দীর্ঘায়িত করা কিংবা তাদের মনোনয়ন প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ তৈরি হবে।

বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্টে কোনো শূন্য পদ তৈরি হলে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কারণ, সেখানে একজন বিচারকের নিয়োগও কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার আদর্শিক ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে।

ট্রাম্পকে নিজের পছন্দের প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে হলে এখন ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতা করতে হতে পারে। ফলে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে তার স্বাধীনতা আগের তুলনায় কমে যাবে।

কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানো ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক সমস্যাগুলোর একটি হতে পারে নিজের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা।

যুক্তরাষ্ট্রে নতুন আইন পাশ করতে হলে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট; দুই কক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন। ফলে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেসে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত আইন পাশ করানো কঠিন হবে।

অভিবাসননীতি, স্বাস্থ্যসেবা, করনীতি, শুল্ক আরোপ এবং সরকারি ব্যয়সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রস্তাবে ডেমোক্র্যাটরা বাধা দিতে পারেন। এমনকি রিপাবলিকানদের সমর্থন ছাড়া ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়ন উদ্যোগগুলো আটকে যেতে পারে।

তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের ভেটো দেয়ার ক্ষমতা থাকবে। কংগ্রেসে পাশ হওয়া কোনো বিলে তিনি ভেটো দিলে তা অগ্রাহ্য করতে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট; উভয় কক্ষেই দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন হবে।

এছাড়া সিনেটে অধিকাংশ সাধারণ আইন নিয়ে বিতর্ক শেষ করে ভোটে যেতে সাধারণত ৬০ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হয়। ফলে দুই কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও ডেমোক্র্যাটদের সব প্রস্তাব সহজে আইনে পরিণত হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, সরকারি অর্থ ব্যয়ের অনুমোদন দেয়ার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। ফলে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বাজেট ও সরকারি অর্থায়ন নিয়ে নতুন করে সমঝোতার প্রয়োজন হবে।

বিশেষ করে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, সীমান্ত নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অর্থ বরাদ্দ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হতে পারে।

ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের বিতর্কিত কর্মসূচিগুলোর অর্থায়ন কমানো বা শর্তসাপেক্ষ করার চেষ্টা করতে পারেন। অন্যদিকে হোয়াইট হাউস নিজের অগ্রাধিকারগুলো বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থ পেতে চাপ সৃষ্টি করবে।

এ ধরনের অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে সরকারি কার্যক্রমের জন্য অর্থ বরাদ্দসংক্রান্ত বিল পাস আটকে যেতে পারে। এমনকি নতুন অর্থবছরের বাজেট কিংবা সাময়িক অর্থায়ন নিয়ে সমঝোতা না হলে সরকারি কার্যক্রম আংশিক বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

ঋণের সর্বোচ্চ সীমা বা ডেবট সিলিং বাড়ানো নিয়েও রাজনৈতিক দর-কষাকষি তীব্র হতে পারে। ফলে বাজেট নিয়ে বিরোধ শুধু ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক সংকটেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; সরকারি কর্মচারী, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও আর্থিক বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিও ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের কঠোর নজরদারির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ, ইউক্রেনকে সহায়তা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ন্যাটোর সঙ্গে সম্পর্ক এবং চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা নিয়ে হোয়াইট হাউসের সিদ্ধান্তগুলো নতুন করে পর্যালোচনার দাবি উঠতে পারে।

আরও পড়ুন:

২০২৬ সালের নির্বাচনে ইরান যুদ্ধের প্রভাবও ছিল উল্লেখযোগ্য। রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ রিপাবলিকানদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।

ডেমোক্র্যাটরা এখন কংগ্রেসের সংশ্লিষ্ট কমিটির মাধ্যমে যুদ্ধের ব্যয়, সামরিক সিদ্ধান্ত এবং পেন্টাগনের ভূমিকা নিয়ে শুনানি ও তদন্ত করতে পারবেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, যুদ্ধ ঘোষণা এবং সামরিক বাহিনীর জন্য অর্থ বরাদ্দের ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা ভোগ করেন।

ফলে পররাষ্ট্রনীতিতে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলেও ডেমোক্র্যাটরা সামরিক ব্যয়, বিদেশি সহায়তা এবং যুদ্ধ পরিচালনার বিষয়ে প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারবেন।

তবে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বা অন্য কোনো সামরিক অভিযান বন্ধ করে দেয়ার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে সরাসরি নেই। এ ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা এবং কংগ্রেসের অর্থায়ন ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতার মধ্যে সংঘাত তৈরি হতে পারে।

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালেও ট্রাম্পের নির্বাহী ক্ষমতা শেষ হয়ে যাবে না। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি নির্বাহী আদেশ জারি করে প্রশাসনের বিভিন্ন সংস্থাকে নির্দেশনা দিতে পারবেন।

তবে ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস এসব আদেশ কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তার আইনি ভিত্তি কী এবং সেগুলোর জন্য সরকারি অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে—তা খতিয়ে দেখতে পারে।

বিশেষ করে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, সরকারি সংস্থার পুনর্গঠন, কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কর্মী ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন জরুরি ক্ষমতা ব্যবহারের বিষয়ে তদন্ত হতে পারে।

ডেমোক্র্যাটরা নির্বাহী আদেশের প্রভাব সীমিত করতে নতুন আইন পাশের উদ্যোগও নিতে পারেন। তবে সেই আইন ট্রাম্পের ভেটোর মুখে পড়লে তা কার্যকর করা কঠিন হবে।

অর্থাৎ, ট্রাম্প নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের নীতি বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে গেলেও প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তাকে আরও বেশি আইনি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতে পারে।

কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানো রিপাবলিকান পার্টির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে এমন বড় পরাজয়ের পর দলের নেতাদের মধ্যে ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশল, নীতিনির্ধারণ এবং নির্বাচনী নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

এবার নির্বাচনে ট্রাম্পের সমর্থিত বেশ কয়েকজন প্রার্থীও পরাজিত হয়েছেন। টেক্সাস, সাউথ ক্যারোলাইনা ও নর্থ ক্যারোলাইনায় তার পছন্দের সিনেট প্রার্থীরা জয় পাননি। এতে প্রার্থী নির্বাচনে ট্রাম্পের রাজনৈতিক বিচারবোধ ও ব্যক্তিগত আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

বিশেষ করে যেসব রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাকে আবার নির্বাচনে লড়তে হবে, তারা নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে হোয়াইট হাউসের কিছু সিদ্ধান্ত থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে পারেন।

এতে ট্রাম্পের অনুগত নেতাদের সঙ্গে দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে ভাবতে থাকা অন্য নেতাদের বিরোধ বাড়তে পারে।

তবে রিপাবলিকান পার্টির ওপর ট্রাম্পের প্রভাব একেবারে শেষ হয়ে যাবে, এমনটা বলা যাবে না। দলের একটি বড় অংশের সমর্থন এখনো তার রাজনৈতিক অবস্থান ও জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভরশীল। তারপরও এই নির্বাচনি বিপর্যয় দলের ভেতরে নতুন নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা ত্বরান্বিত করতে পারে।

২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ২২তম সংশোধনী অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি দুইবারের বেশি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেন না। ট্রাম্প ইতোমধ্যে দুই মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ায় ২০২৮ সালে আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার সাংবিধানিক সুযোগ তার নেই।

ফলে রিপাবলিকান পার্টির সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন; ট্রাম্পের পর দলের নেতৃত্ব দেবেন কে? ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সসহ দলের অন্য সম্ভাব্য নেতারা নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করতে পারেন।

কংগ্রেসে এই পরাজয় ট্রাম্পের রাজনৈতিক প্রভাবকে দ্রুত দুর্বল করতে পারে। একই সঙ্গে তার উত্তরসূরি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে রিপাবলিকানদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে।

অন্যদিকে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়া ডেমোক্র্যাটরা ২০২৮ সালের নির্বাচনের আগে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করার সুযোগ পাবেন। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত, জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা এবং পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিতর্ককে তারা নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।

তবে কংগ্রেসের নির্বাচনে জয়লাভ করলেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় নিশ্চিত হয়ে যায় না। আগামী দুই বছরে তারা কতটা কার্যকরভাবে নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার ফলে ডেমোক্র্যাটরা শুধু আইন প্রণয়ন বা তদন্তের ক্ষমতাই পাবেন না, বরং জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার একটি শক্তিশালী মঞ্চও পাবেন।

কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটির প্রকাশ্য শুনানি, প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং নীতিগত বিতর্ক টেলিভিশন ও সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পেতে পারে। এর মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে জনমত গঠনের সুযোগ পাবেন।

রয়টার্সে প্রকাশিত নির্বাচনি জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার চেয়েছেন কংগ্রেস যেন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে। ফলে ডেমোক্র্যাটদের সামনে এখন সেই প্রত্যাশা পূরণের চাপও থাকবে।

বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন, যুদ্ধের ব্যয় এবং সরকারি দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে তারা ধারাবাহিকভাবে প্রচার চালাতে পারেন।

তবে ডেমোক্র্যাটদের জন্যও এটি একটি পরীক্ষা। তারা যদি কেবল ট্রাম্পবিরোধী অবস্থানে সীমাবদ্ধ থাকেন এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখতে না পারেন, তাহলে এই রাজনৈতিক সুবিধা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।

২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের দুই কক্ষ হারানো ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য নিঃসন্দেহে বড় রাজনৈতিক ধাক্কা। নির্বাচনের ফলাফল শুধু রিপাবলিকানদের সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর ঘটনা নয়; এটি ট্রাম্পের নেতৃত্ব, নীতিনির্ধারণ এবং রাজনৈতিক কৌশলের প্রতিও ভোটারদের অসন্তোষের প্রতিফলন।

তবে এই জয় ডেমোক্র্যাটদের হাতে ট্রাম্পকে সরিয়ে দেয়ার ক্ষমতা তুলে দেয়নি। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার নির্বাহী ক্ষমতা, ভেটো দেয়ার অধিকার এবং সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ কর্তৃত্ব বহাল থাকবে।

এছাড়া নির্বাচনে জয় পেলেও নতুন কংগ্রেসের সদস্যরা দায়িত্ব গ্রহণ করবেন ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে। অর্থাৎ, ততদিন পর্যন্ত রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত বর্তমান কংগ্রেসই দায়িত্ব পালন করবে।

এরপর আগামী দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি আরও বেশি সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একদিকে ডেমোক্র্যাটরা তদন্ত, বাজেট ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করবেন; অন্যদিকে ট্রাম্প নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের রাজনৈতিক কর্মসূচি এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবেন।

সব মিলিয়ে, ডেমোক্র্যাটদের এই জয় ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির অবসান ঘটাচ্ছে না, তবে তার শেষ দুই বছরকে রাজনৈতিকভাবে আরও কঠিন, সংঘাতপূর্ণ এবং অনিশ্চিত করে তুলছে।

তথ্যসূত্র: টাইমস নাও, দ্য গার্ডিয়ান, আলজাজিরা, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, রয়টার্স

এসএস