লন্ডনের স্কুলছাত্রী থেকে সিরিয়ার ক্ষমতার কেন্দ্রে; স্বামীর শাসনে কতটা প্রভাবশালী ছিলেন আসমা

আসমা-আল-আসাদ
বিদেশে এখন
1

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের শাসনের পতন দেশটির ভেতরে ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা সিরীয়দের হতবাক করে দেয়। এর আগে ১৩ বছর ধরে আসাদ সরকারের সামরিক ও গোয়েন্দা সংস্থা নিজেদের দেশের বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করে। এতে অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ নিহত হন, অর্ধেকের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হন এবং বহু শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

শাসকগোষ্ঠীর নেতারা প্রতিশোধ এড়াতে উপসাগরীয় অঞ্চল ও মস্কোয় পালিয়ে যান বা আত্মগোপন করেন। এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে গণকবরের সন্ধান মেলে। একইসঙ্গে উন্মোচিত হয় নির্যাতনকেন্দ্র ও গোপন আটককেন্দ্রের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, যেখানে হাজারো মানুষকে আটকে নির্যাতন করা হয়েছিল।

এই পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় ব্যক্তিদের একজন ছিলেন একজন ব্রিটিশ নাগরিক।

সিরিয়ার সাবেক ফার্স্ট লেডি ও প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের স্ত্রী আসমা আল-আসাদ লন্ডনে জন্মগ্রহণ ও বেড়ে ওঠেন। পরে তিনি দামেস্কে চলে যান। যুদ্ধের বছরগুলোতে তিনি সিরিয়ার অর্থনীতির ওপর নিজের প্রভাব সুসংহত করেন। তবে দ্য অবজারভারের এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আর্থিক প্রভাবের বাইরে গিয়ে আসমা শাসনব্যবস্থার পরিচালনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ছিলেন।

আসাদ পরিবারের একসময়কার ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্রের বরাতে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিরিয়ার নেতৃত্বে বাশার আল-আসাদের সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে রাশিয়া আসমাকে বিবেচনা করছিল। আন্তর্জাতিক সহায়তাসহ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন খাতে তিনি উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জাতিসংঘের জানা ছিল, এসব সহায়তার একটি অংশ আত্মসাৎ করা হচ্ছিল। এমনকি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তার দাতব্য সংস্থার পরিচালিত এতিমখানার শিশুদের রাজনৈতিক দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলেও, তিনি তা ঠেকাতে কোনো ভূমিকা নেননি। তিনি একটি ‘অর্থনৈতিক পরিষদের’ প্রধান ছিলেন, যা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ সৃষ্টি করত, হয়রানি চালাত এবং গ্রেপ্তারের হুমকি দিত।

দ্য অবজারভার দু’টি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, আসমা আল-আসাদের দুই ভাইকে যুক্তরাজ্যে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়নি। এছাড়া যুক্তরাজ্যের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেছেন, আসমাকেও দেশটিতে স্বাগত জানানো হবে না। তবে তার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিলের কোনো ইঙ্গিত এখনো পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ডামাস্কাস শহরের উপকণ্ঠে দুটি বেসমেন্ট বা ভূগর্ভস্থ কক্ষ থেকে সিরিয়ার সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা মানবদেহের অবশিষ্টাংশ উদ্ধার করেন। |undefined

দ্য অবজারভার আরও জানিয়েছে, আসমা ও তার স্বামী বাশার আল-আসাদের সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) বসবাসের অনুমতি রয়েছে। তারা নিয়মিত দুবাইয়ে যাতায়াত করেন। গত মাসে আসমা সর্বশেষ সেখানে গিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে সময় তিনি ওয়ালডর্ফ অ্যাস্টোরিয়া হোটেলে অবস্থান করেছিলেন।

বাশার আল-আসাদ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম পলাতক ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত। সিরিয়ার সংঘাত চলাকালে সংঘটিত কথিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে একাধিক আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরোয়ানাগুলো জারি করেছে ফ্রান্স। একটি ২০১৩ সালের ঘৌটা রাসায়নিক হামলার ঘটনায়, যেখানে সারিন গ্যাসে শত শত বেসামরিক মানুষ নিহত হন। অন্যটি ২০১২ সালে হোমস শহরে গোলাবর্ষণের সময় সাংবাদিক মারি কোলভিন ও রেমি ওখলিক নিহত হওয়ার ঘটনায়।

সিরিয়ায় সংঘটিত কথিত অপরাধের বিচার করার এখতিয়ার আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) নেই। কারণ, দেশটি আদালত প্রতিষ্ঠাকারী রোম সংবিধির সদস্য নয়। ফলে জবাবদিহি নিশ্চিতের প্রচেষ্টা মূলত বিভিন্ন দেশের জাতীয় আদালতের ওপর নির্ভর করছে, বিশেষ করে যেসব আদালত সার্বজনীন এখতিয়ার–সংক্রান্ত আইন প্রয়োগ করতে পারে।

তবে ব্রিটিশ নাগরিক হওয়ায় আসমা আল-আসাদ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) এখতিয়ারের আওতায় পড়তে পারেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন এবং যুক্তরাজ্যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হতে পারে। আইসিসির সাবেক প্রধান কৌঁসুলি লুইস মোরেনো-ওকাম্পো বলেন, ‘তিনি ব্রিটিশ নাগরিক। এটিই একটি সুযোগ, কারণ তিনি এমন একটি দেশের নাগরিক, যে দেশ রোম সংবিধির সদস্য।’

২০২১ সালে যুক্তরাজ্যের মেট্রোপলিটন পুলিশের যুদ্ধাপরাধ ইউনিট অভিযোগ খতিয়ে দেখে যে, সিরীয় সরকারকে সমর্থন এবং সংঘাত চলাকালে শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে প্রচার চালানোর মাধ্যমে আসমা অপরাধে জড়িয়েছিলেন কি না। এ বিষয়ে একটি নথি তৈরি করে পুলিশ তা ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিসের (সিপিএস) কাছে পাঠায়। তবে আসমার যুক্তরাজ্যে ফেরার সম্ভাবনা কম থাকায় মামলাটি এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে বাস্তব প্রতিবন্ধকতাই সিপিএসের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছিল বলে মনে করা হয়।

বিদেশে গিয়ে যুদ্ধে অংশ নেয়া বা উগ্রপন্থি সংগঠনে যোগ দেয়ার কারণে, এর আগেও কয়েকজন ব্রিটিশ নাগরিকের নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন পূর্ব লন্ডনের শামীমা বেগম, যিনি ইসলামিক স্টেটে (আইএস) যোগ দিতে সিরিয়ায় গিয়েছিলেন।

তবে আসমার ঘটনা ব্যতিক্রমী বলে মনে করা হচ্ছে। আধুনিক ইতিহাসে গণহত্যার অভিযোগে ব্যাপকভাবে অভিযুক্ত কোনো সরকারের এত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আর কোনো ব্রিটিশ নাগরিক ছিলেন না।

আসাদ পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানিয়েছে, তাদের সন্তানদের পাশাপাশি আসমার মা ও তার এক ভাই ফিরাশ আখরাস বর্তমানে দুবাইয়ে বসবাস করছেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, আসমা ও বাশার আল-আসাদের সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসের অনুমতি রয়েছে। তবে তাদের জানিয়ে দেয়া হয়েছে, আপাতত তারা সেখানে কেবল যাতায়াত করতে পারবেন, স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারবেন না। যদিও সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করাই তাদের লক্ষ্য।

আসমা আল-আসাদ লন্ডনের অ্যাক্টনে বেড়ে উঠেছেন এবং দেশটির কুইন্স কলেজে পড়াশোনা করেছেন। | ছবি: সংগৃহীত

আসাদ পরিবারকে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা নাগরিকত্ব দেয়া হলে তা হবে একটি ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত, যার উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাজ্যের মিত্র দেশ। দুই দেশের মধ্যে ২০০৮ সালের এপ্রিল থেকে একটি দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি কার্যকর রয়েছে। দ্য অবজারভার আসাদ পরিবারের বসবাসের অবস্থান সম্পর্কে সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের কাছে জানতে চাইলেও কোনো মন্তব্য পায়নি।

লেবাননের রাজধানী বৈরুতে নিজ বাসা থেকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আসমা আল-আসাদের চাচাতো ভাই আবদো আল-দাব্বাগ বলেন, ‘তিনি আপনার–আমার চেয়েও ভালো আছেন। বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে আছেন। তার সন্তানেরাও আগের চেয়ে ভালো আছে।’

তার দাবি, বিয়ের আগে লন্ডনে বিনিয়োগ ব্যাংকার হিসেবে কাজ করা আসমা এখন তার ছোট ছেলে করিমকে চীনে ব্যবসায়িক স্বার্থ গড়ে তুলতে সহায়তা করছেন। করিম অনর্গল ম্যান্ডারিন ভাষায় কথা বলতে পারেন।

আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, সাবেক প্রেসিডেন্ট দম্পতির বুলগেরিয়া, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও লেবাননসহ বিভিন্ন দেশে এখনো বিনিয়োগ রয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী টবি ক্যাডম্যানের মতে, আসাদ পরিবারের বিকল্প ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে। তিনি বলেন, ‘বাশার যদি সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোনো কৌশলগত স্বার্থই পূরণ করতে না পারেন, তাহলে তার মূল্য আর কী?’ ক্যাডম্যানের ধারণা, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পরিবর্তন ঘটছে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত পশ্চিমা বিশ্বের দিকে আরও ঝুঁকছে। তার ভাষায়, ‘আমার মনে হয় না, সেখানে থাকলে তারা প্রত্যর্পণ বা বিচার থেকে খুব বেশি নিরাপদ থাকবেন।’

সাবেক ফার্স্ট লেডির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের দাবি জোরালো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক ও দেশিয় বিভিন্ন সংস্থার ওপর চাপ বাড়ছে। একই সময়ে তদন্তকারী, সাংবাদিক এবং নিহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনেরা ভবিষ্যতের বিচারপ্রক্রিয়ায় ব্যবহারযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহ করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আসমার এক স্কুলবন্ধুর ভাষ্য, কিশোরী বয়সে আসমা নিজেকে ‘এমা’ নামে পরিচয় দিতেন। তার দাবি, লন্ডনে সিরীয় দূতাবাসে কর্মরত আসমার মায়ের উদ্যোগেই ২৬ বছর বয়সী বাশার আল-আসাদের সঙ্গে তার পরিচয় ও সম্পর্কের সূচনা হয়।

ওই বন্ধুর মতে, ১৯৯০–এর দশকের শুরুতে, এ-লেভেলের শেষ বর্ষে মধ্য লন্ডনের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কুইন্স কলেজে পড়ার সময় তাদের বিয়ের বিষয়টি ঠিক হয়। সেসময় বাশার আল-আসাদ লন্ডনে চক্ষুবিজ্ঞানে পড়াশোনা করছিলেন। বন্ধুটি বলেন, ‘সে বলেছিল, একজনের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে এবং এ নিয়ে খুব উত্তেজিত ছিল। মনে হয়েছিল, যেন তাকে বলা হচ্ছে ‘‘এটাই হয়তো তোমার ভবিষ্যৎ’’।’

তবে শুরুতে দুজনের জীবন ভিন্ন পথে এগোচ্ছিল। ১৯৯৪ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় বড় ভাইয়ের মৃত্যু হলে বাশার আল-আসাদকে লন্ডনে চক্ষুবিজ্ঞানের পড়াশোনা ছেড়ে সিরিয়ায় ফিরে যেতে হয়। এরপর তার বাবা ও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল-আসাদ উত্তরাধিকার পরিকল্পনা নতুন করে সাজাতে বাধ্য হন। সেই প্রেক্ষাপটে বাশারই একমাত্র গ্রহণযোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে সামনে আসেন।

২০০২ সালের ডিসেম্বরে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটের ভেতরে টনি ব্লেয়ার ও শেরি ব্লেয়ারের সঙ্গে বাশার আল-আসাদ ও আসমা। | ছবি: সংগৃহীত

বিয়ের আগে আসমা আখরাস লন্ডনে প্রথমে ডয়চে ব্যাংক, পরে জেপি মরগ্যানে কর্মজীবন গড়ে তোলেন। তবে বাশার আল-আসাদ আবার যোগাযোগ করার পর তিনি যেন সবকিছু ছেড়ে দিতে প্রস্তুত ছিলেন।

জেপি মরগ্যানের জ্যেষ্ঠ ট্রেডার পল গিবস, যার সঙ্গে আসমার পরিচয় হয়েছিল; স্মরণ করেন, এক দিন উচ্চাকাঙ্ক্ষী ওই তরুণ বিশ্লেষক কাজে আসেননি। সহকর্মীরা উদ্বিগ্ন হয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। পরে তারা জানতে পারেন, নতুন বাগদত্তা বাশার আল-আসাদের সঙ্গে তিনি লিবিয়ার মরুভূমিতে দেশটির তৎকালীন শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির অতিথি হিসেবে ছুটি কাটাচ্ছেন।

জেপি মরগ্যানে আসমার প্রত্যক্ষ ব্যবস্থাপক জানান, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করার বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা ধরা পড়ার পর তার চাকরির ইতি ঘটে। ব্যবস্থাপকের ভাষ্য, ব্যাংকে সময় দেয়ার পরিবর্তে তিনি সিরিয়ার ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছিলেন।

পল গিবস বলেন, ‘সে যা করেছিল, তাতে সবাই বিস্মিত হয়েছিল। সবকিছু ছেড়ে দিয়ে দামেস্কে গিয়ে বসবাস শুরু করেছিল।’

১৯৯০-এর দশক ও ২০০০-এর দশকের শুরুজুড়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো হাফেজ আল-আসাদের শাসনামলে নির্যাতন, নির্বিচার আটক এবং কারাগারে মানুষ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নথিভুক্ত করছিল। সিরিয়ার ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি পরিবারে বেড়ে ওঠায় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ সম্পর্কে আসমার অবগত থাকার কথা ছিল।

১৯৮২ সালে মুসলিম ব্রাদারহুডের সশস্ত্র বিদ্রোহ দমনের নামে হাফেজ আল-আসাদের সরকার ব্যাপক সামরিক অভিযান চালায়। এতে বিপুলসংখ্যক বেসামরিক মানুষ আটক হন এবং প্রায় ৪০ হাজার মানুষ নিহত হন।

২০০০ সালের জুনে ৬৯ বছর বয়সে হাফেজ আল-আসাদের মৃত্যু হলে বাশার আল-আসাদ সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন। ছয় মাস পর এক ব্যক্তিগত আয়োজনে তিনি আসমাকে বিয়ে করেন।

দামেস্কে যাওয়ার পরপরই নতুন ফার্স্ট লেডি একের পর এক বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) গড়ে তোলেন। ক্ষুদ্রঋণ ও শিক্ষামূলক প্রকল্পের মাধ্যমে সিরীয়দের ক্ষমতায়ন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করাই ছিল এসব প্রতিষ্ঠানের ঘোষিত উদ্দেশ্য। পরে তার সব উদ্যোগ ‘সিরিয়া ট্রাস্ট ফর ডেভেলপমেন্ট’র অধীনে আনা হয়। সংস্থাটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বহু মেধাবী ও উদ্যমী মানুষকে আকৃষ্ট করেছিল।

দ্য অবজারভার সংস্থাটির কয়েকজন সাবেক কর্মীর সঙ্গে কথা বলেছে। তাদের ভাষ্য, সিরিয়ার উন্নয়নে আসমার উচ্চাকাঙ্ক্ষা আন্তরিক বলেই মনে হয়েছিল। ২০০৬ সালে সংস্থাটিতে জ্যেষ্ঠ গবেষণা বিশ্লেষক হিসেবে যোগ দেয়া জাকি মেহচি বলেন, ‘তখন আমার বিশ্বাস ছিল, তিনি একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থার মধ্যেও ইতিবাচক কিছু করার চেষ্টা করছিলেন।’

কিন্তু সেই আশা পূরণ হয়নি।

২০১১ সালে আরব বসন্তের ঢেউ সিরিয়ায় পৌঁছানোর পর শাসকগোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়া সেই ধারণা ভেঙে দেয় যে, চাপের মুখে বাশার আল-আসাদ তার বাবার চেয়ে ভিন্নভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো শুরু হয়। হাজারো মানুষকে গ্রেপ্তার করে দেশের কুখ্যাত আটককেন্দ্রগুলোতে নিয়ে যাওয়া হয়, যাদের অনেকেই পরে নিখোঁজ হন।

সেবছরের শুরুতে সরকারবিরোধী গ্রাফিতি আঁকার অভিযোগে একদল কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয় এবং নখ উপড়ে ফেলার অভিযোগ ওঠে। কয়েক সপ্তাহ পর এক বিক্ষোভ থেকে আটক ১৪ বছর বয়সী হামজা আল-খতিবের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তার শরীরে নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন ছিল।

হামজার পরিবারের অভিযোগ, নির্যাতনের সময় তার যৌনাঙ্গ কেটে ফেলা হয়েছিল। মরদেহ পরীক্ষা করা চিকিৎসকেরা তাদের জানান, মৃত্যুর আগে তাকে দীর্ঘ সময় জীবিত রাখা হয়েছিল এবং জোর করে পানি পান ও প্রস্রাব করতে বাধ্য করা হয়েছিল।

সেসময় আসমা আল-আসাদ শাসকগোষ্ঠীকে সংযত করার চেষ্টা করবেন, এমন আশা করেছিলেন তার পরিচিতজন ও সহকর্মীরা। বিক্ষোভ শুরুর কয়েক মাস পর আসমার সহযোগী চার সিরীয় নারী তার সঙ্গে দেখা করার আবেদন জানান। প্রেসিডেন্ট ভবনের নিচে তার ব্যক্তিগত কার্যালয়ে তারা একজন মা হিসেবে আসমার প্রতি আবেদন জানান এবং স্মরণ করিয়ে দেন, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের শিকার শিশুদেরও হতে হচ্ছে।

সেখানে উপস্থিত হুদা মুজারকিহ বলেন, ‘শুরুতে আসমাকে তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে দেখা যাচ্ছিলো। কিন্তু একটি ফোনকল ধরতে বাইরে যাওয়ার পর ফিরে এসে তার আচরণ বদলে যায়।’ মুজারকিহের ধারণা, ফোনটি গোয়েন্দা সংস্থার কারও ছিল। তার ভাষ্য, ‘আমার মনে হয়, সোফার ভেতরে আড়ি পাতার একটি যন্ত্র ছিল, যা আমাদের কথাবার্তা শুনছিল।’ সম্ভবত এরপর তাকে ফোন করে বলা হয়েছিল, ‘‘তোমাকে আরও কঠোর হতে হবে এবং তোমার কথা বলার ধরন বদলাতে হবে’’।’

একই ধরনের আবেদন করা হয়েছিল ‘সিরিয়া ট্রাস্ট ফর ডেভেলপমেন্ট’র মাধ্যমেও। সংস্থাটির সাবেক কর্মীদের গ্রেপ্তার শুরু হলে জাকি মেহচিসহ অন্যরা আশা করেছিলেন, ফার্স্ট লেডি তার অবস্থান ব্যবহার করে হস্তক্ষেপ করবেন। মেহচি বলেন, ‘তখন আমরা বিশ্বাস করতাম, তিনি আমাদের পাশে দাঁড়াবেন। শেষ পর্যন্ত আমরা তো তারই প্রতিষ্ঠানের কর্মী ছিলাম।’

কিন্তু ২০১২ সালে ট্রাস্টের সাবেক কর্মী রিমা দালি ‘হত্যা বন্ধ করুন; আমরা সবার জন্য একটি সিরিয়া চাই’ লেখা প্ল্যাকার্ড বহনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হলে আসমা কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।

যুদ্ধের অধিকাংশ সময়ই ফার্স্ট লেডি নীরব ছিলেন। তবে ২০১৬ সালে তিনি রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল রাশিয়া২৪-কে একটি সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি বলেন, কখনোই সিরিয়া বা তার স্বামীকে ছেড়ে যাওয়ার কথা ভাবেননি। তার ভাষায়, ‘আমি তার পাশে ছিলাম, কারণ আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমাকে অন্য কিছু করতে বলেনি।’

তবে এই বক্তব্যের আড়ালে ভেঙে পড়া এক দাম্পত্য সম্পর্কের গল্পও ছিল। সেখানে বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগও ওঠে। আসাদের এক পুরোনো বন্ধুর দাবি, আসমার বাবা একটি সমঝোতার মাধ্যমে সম্পর্কটি টিকিয়ে রাখেন। সেই সমঝোতার অংশ হিসেবে আসমাকে নিজের ব্যবসা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় আরও বেশি ক্ষমতা ও স্বাধীনতা দেয়া হয়। তবে আসমার বাবা ফাওয়াজ আখরাস দ্য অবজারভারকে বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের পরকীয়ার অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। দম্পতির মধ্যে তিনি পুনর্মিলন ঘটিয়েছেন, এ দাবিও তার ভাষায় ‘‘সম্পূর্ণ কাল্পনিক’’।’

এরই মধ্যে আসমা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার বিভিন্ন উপায়ও খুঁজে বের করেছিলেন। সিরিয়ার বাইরে থাকা সহযোগীদের মাধ্যমে তিনি প্যারিসের একটি কর্মশালা থেকে কয়েক হাজার পাউন্ড মূল্যের আসবাব, মিং রাজবংশের একটি ফুলদানি এবং হাতে তৈরি গয়না কিনিয়েছিলেন। ২০২০ সালের মধ্যে তিনি জাতীয় পর্যায়ের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় হয়ে ওঠেন।

সিরিয়ার অর্থনীতি–বিষয়ক অনলাইন প্রকাশনা সিরিয়া রিপোর্ট’র প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক জিহাদ ইয়াজিজি বলেন, ‘তার প্রকৃত ভূমিকা কী ছিল, তা পুরোপুরি না বুঝলেও আমরা ধীরে ধীরে তার প্রভাব বাড়তে দেখেছি।’ তার মতে, শাসকগোষ্ঠীর কার্যত অর্থব্যবস্থাপক হিসেবে আসমা দায়িত্ব নেয়ার পর সেই ভূমিকা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

দুই দশক ধরে বাশার আল-আসাদের শতকোটিপতি চাচাতো ভাই রামি মাখলুফকে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে করা হতো। সিরিয়ার সবচেয়ে ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের একজন হিসেবে পরিচিত মাখলুফের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য ছিল সম্পত্তি, নির্মাণ ও তেল খাতজুড়ে। এছাড়া দেশের মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক ও শুল্কমুক্ত বাণিজ্যেও তার উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ ছিল।

কিন্তু যুদ্ধের কারণে সিরিয়ার অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং সরকারের অর্থের প্রয়োজন বাড়তে থাকে। একইসময়ে সিরিয়াকে দেয়া সহায়তার বিপরীতে পাওনা অর্থ পরিশোধে আসাদ সরকারের ওপর চাপ বাড়ায় রাশিয়া। এমন পরিস্থিতিতে বাশার আল-আসাদ অর্থের জন্য রামি মাখলুফের দ্বারস্থ হলে তিনি তাতে অনাগ্রহ দেখান বলে বিভিন্ন সূত্রের দাবি। এসব সূত্রের মতে, আসমা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মাখলুফের প্রভাব খর্ব করেন।

পরে শাসকগোষ্ঠী মাখলুফের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ কর বকেয়ার অভিযোগ আনে। তাকে গৃহবন্দী করা হয়। তার নিয়ন্ত্রণাধীন কোম্পানিগুলো হয় বন্ধ করে দেয়া হয়, নয়তো আসমার এনজিও নেটওয়ার্ক–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে তুলে দেয়া হয়। এতে মাখলুফের উল্লেখযোগ্য ক্ষমতা ও প্রভাব আসমা এবং তার ঘনিষ্ঠদের হাতে চলে যায়।

জিহাদ ইয়াজিজি বলেন, ‘তার লোকজনের অজান্তে কোনো বড় আর্থিক লেনদেন বা গুরুত্বপূর্ণ ভূমি–সম্পর্কিত চুক্তি হতো না। প্রতিটি শহরেই তার লোক ছিল। আসমার দপ্তরের কর্মকর্তারা ‘‘রজাল আল-সিত্ত’’ বা ‘‘নারীর লোক’’ নামে পরিচিত ছিলেন। এখানে ‘‘নারী’’ বলতে আসমা আল-আসাদকেই বোঝানো হতো।’

২০০২ সালে বাকিংহাম প্যালেসে আসমা ও আসাদ রানির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। | ছবি: সংগৃহীত

নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত নথিতে এসব ব্যক্তিকে আসমা আল-আসাদের নেতৃত্বাধীন একটি ‘অর্থনৈতিক পরিষদ’র সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যবসায়ী, উপদেষ্টা ও সরকারঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত এই অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক প্রেসিডেন্ট পরিবারের অর্থনৈতিক বিষয়গুলো পরিচালনায় সহায়তা করত।

এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিলেন ইয়াসার ইব্রাহিম ও আলী নাজিব ইব্রাহিম। তারা আসমার শীর্ষ অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করতেন। শাসকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ সূত্রের ভাষ্য, রামি মাখলুফের পতনের পর সিরীয় কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ এবং বড় বড় সম্পদের মালিকানা পুনর্গঠনে তারা কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেন। মাখলুফ যদি পুরোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতীক হয়ে থাকেন, তাহলে ইব্রাহিমরা ছিলেন আসমাকেন্দ্রিক নতুন অর্থনৈতিক কাঠামোর মুখ।

শাসকগোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো দ্য অবজারভারকে জানিয়েছে, ফার্স্ট লেডি ছিলেন ক্ষমতাকেন্দ্রিক এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে অনুগত ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পদোন্নতি দিতেন। জিহাদ ইয়াজিজি বলেন, ‘তিনি ছিলেন একজন গুণ্ডার মতো। মানুষকে গ্রেপ্তার করা হতো, এমনকি নির্যাতনও করা হতো। ব্যবসায়ীদের ওপর ব্যবসা ছেড়ে দেয়ার জন্য চাপ দেয়া হতো।’

তিনি আরও বলেন, ‘অভিযোগ রয়েছে, যারা তার নির্দেশ মানতেন না, তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হতো। তাদের কারখানা বন্ধ করে দেয়া হতো, ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হতো অথবা তাদের বিরুদ্ধে কর ফাঁকির অভিযোগ আনা হতো।’

তবে আসমার বাবা ফাওয়াজ আখরাস দ্য অবজারভারকে বলেন, ‘সিরিয়ায় ব্যবসা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ নিয়ে আমার মেয়ের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে, সেগুলোর কোনোটিই কখনো প্রমাণিত হয়নি।’

আসমার ক্ষমতার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ছিল প্রায় এক দশকের যুদ্ধে বিধ্বস্ত সিরিয়ার অর্থনীতি ও অবকাঠামো। দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ ন্যূনতম খাদ্যের জন্য সংগ্রাম করছিল। তবে এই সংকটও তার জন্য সুযোগ তৈরি করে। সে সময় জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক দাতাদের সহায়তাই ছিল দেশের অন্যতম প্রধান অর্থের উৎস। এসব সহায়তার বড় অংশ তার প্রতিষ্ঠিত ‘সিরিয়া ট্রাস্ট ফর ডেভেলপমেন্ট’র মাধ্যমে পরিচালিত হতো।

সিরিয়ায় ত্রাণ কার্যক্রমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, দেশে আসা মানবিক ও উন্নয়ন সহায়তার যতটা সম্ভব নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে আসমা একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। তার দাবি, জাতিসংঘও জানত যে শাসকগোষ্ঠী এসব সহায়তা থেকে লাভবান হচ্ছে। বিষয়টি সংস্থার ভেতরে নৈতিক দ্বিধার সৃষ্টি করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়, এই মূল্য মেনেই ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হবে, যদিও তাতে প্রকৃত প্রয়োজনমতো সহায়তা খুব কমসংখ্যক মানুষের কাছেই পৌঁছাত।

অভিযোগ রয়েছে, সিরীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যখন শত শত শিশুকে যুদ্ধের সময় দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে আটকে রাখছিল—কখনো বন্দী বিনিময়ের জন্য, আবার কখনো আটক বা বিরোধী পক্ষের সঙ্গে যুক্ত অভিভাবকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে, তখন ফার্স্ট লেডি আসমা আল-আসাদও তা নীরবে প্রত্যক্ষ করেছিলেন।

দ্য অবজারভার এমন কিছু নথি পর্যালোচনা করেছে, যেখানে আসমা আল-আসাদের এনজিওর অর্থায়ন ও তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এতিমখানাগুলোকে শিশুদের আত্মীয়দের কাছে হস্তান্তর না করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ফার্স্ট লেডির পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মীর দাবি, প্রতিবেদন ও সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে তারা এ বিষয়ে আসমাকে অবহিত করেছিলেন।

এতিমখানার এক কর্মী বলেন, ‘তিনি সব অপরাধ সম্পর্কে জানতেন। শতভাগ জানতেন।’ আরেকজন কর্মীর দাবি, শিশুদের বিষয়ে প্রশ্ন তুললে আসমা তাকে ‘নিজের কাজ নিয়ে থাকতে’ বলেন। তার ভাষ্য, এসব শিশু ‘সন্ত্রাসীদের সন্তান’।

ডামাস্কাস শহরে সিরীয় শাসকগোষ্ঠীর কর্মকর্তাদের ব্যবহৃত একটি নির্যাতন ও গোয়েন্দা কেন্দ্রে আইডি (পরিচয়পত্র) এবং অন্যান্য জিনিসপত্র পাওয়া যায়। | ছবি: সংগৃহীত

শাসকগোষ্ঠীর শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা খুব কম ক্ষেত্রেই নিজেরা সরাসরি নির্দেশ দিতেন। তাই আসমার স্বাক্ষরযুক্ত এমন কোনো নথি পাওয়া কঠিন, যা লিখিতভাবে তার দায় প্রমাণ করবে। তবে দ্য অবজারভার বলছে, তারা শাসকগোষ্ঠী ও ফার্স্ট লেডির ঘনিষ্ঠ একাধিক ব্যক্তির সাক্ষ্য পেয়েছে। আলাদাভাবে কথা বলা এসব ব্যক্তির বর্ণনায় একই ধরনের তথ্য উঠে এসেছে।

আসমার বাবা ফাওয়াজ আখরাস এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার ভাষ্য, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অথবা বন্দী ও তাদের পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে শিশুদের ব্যবহার সম্পর্কে আসমা জানতেন, এতে সম্মতি দিয়েছিলেন, সহায়তা করেছিলেন বা নীরবে মেনে নিয়েছিলেন, এমন অভিযোগ ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’। একইভাবে মানবিক ও উন্নয়ন সহায়তা নিয়ন্ত্রণে নেয়ার জন্য তিনি কোনো নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন, এ অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।

ফাওয়াজ আখরাস আরও বলেন, এসব অভিযোগ তার মেয়েকে ক্ষমতালোভী, উচ্চাভিলাষী ও অন্যায়কারী হিসেবে তুলে ধরে; যা তার পরিচিত আসমার ব্যক্তিত্ব বা গত দুই দশকে তার কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

এদিকে, প্রেসিডেন্ট ভবনের ভেতরেও আসমার প্রভাব বাড়ছিল। শাসকগোষ্ঠীর এক সূত্রের ভাষ্য, ‘তিনি সম্মতি না দিলে রাষ্ট্রপতির কাছে কোনো প্রস্তাবই যেত না। কারণ, সব বিষয়েই রাষ্ট্রপতি তার সঙ্গে আলোচনা করতেন। দিনের বেলায় কোনো বিষয়ে সমঝোতা হলেও রাতে ব্যক্তিগত আলোচনার পর তা বদলে যেতে পারত। রাজনীতি, ব্যবসা কিংবা ব্যক্তিগত; ছোট-বড় সব বিষয়েই তিনি আসমার সঙ্গে পরামর্শ করতেন।’

একজন প্রভাবশালী সিরীয় ব্যবসায়ীর দাবি, সরকারি কর্মকর্তারা প্রায়ই ফার্স্ট লেডির নাম উল্লেখ করতেন। তিনি বলেন, ‘তারা বলতেন, ‘‘লেডি এটাই চান’’ অথবা ‘‘এই সিদ্ধান্ত লেডির কাছ থেকে এসেছে’’।’ তার ভাষ্য, ‘ব্যবসায়ীরা সব সময় নজরদারিতে থাকতেন। নিরাপত্তা ও সামরিক সংস্থা, এমনকি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্যও তার নিজস্ব একটি দল ছিল। সেখানে তার অনুগত দুইজন মন্ত্রী দায়িত্বে ছিলেন।’

আরেকটি সূত্রের দাবি, এ কারণে সরকারের অনেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আসমার প্রতি বিরূপ ছিলেন। সূত্রটি বলেছে, ‘ব্যবসায়ীরা তাকে ঘৃণা করতেন, কারণ তিনি তাদের কাজে অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ করতেন। নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও তাকে অপছন্দ করতেন, কারণ রাষ্ট্রপতির ওপর তার প্রভাব তারা স্পষ্টভাবে দেখতেন। মন্ত্রীরাও তাকে ভালো চোখে দেখতেন না, কারণ তিনি তাদের কাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় হস্তক্ষেপ করতেন। সবার ধারণা ছিল, এটি তার দায়িত্ব নয়। তিনি ফার্স্ট লেডি, দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি নন।’

২০১৬ সালে আলেপ্পোর আবাসিক এলাকায় আসাদ বাহিনীর হামলার পর বেসামরিক নাগরিকেরা একজন আহত ব্যক্তিকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন। | ছবি: সংগৃহীত

‘সিরিয়া ট্রাস্ট ফর ডেভেলপমেন্ট’র নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাবেক কর্মীর মতে, আসমাকে একজন কৌশলী রাজনৈতিক খেলোয়াড় হিসেবে যেভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, তা যুদ্ধের আগে তার পরিচিত আসমার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মেলে না। তিনি বলেন, ‘তিনি মোটেও তেমন ছিলেন না। তাই আমি বরং বিশ্বাস করতে চাই, তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে বলা হয়েছিল, তিনি চলে গেলে তার সন্তানদের ভুগতে হবে।’

২০২৩ সালের মধ্যে রাসায়নিক অস্ত্র হামলা ও গণহত্যার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম থেকে অনেকটাই সরে যায়। একই সময়ে সিরিয়াকে আবার আরব লীগে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং জাতিসংঘের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের আসমার সঙ্গে প্রকাশ্যে ছবি তুলতেও দেখা যায়।

তবে এসময়ের মধ্যে রাশিয়া বাশার আল-আসাদের ওপর ক্রমেই অসন্তুষ্ট হয়ে উঠেছিল। একাধিক সূত্রের দাবি, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দীর্ঘদিন ধরেই আসাদকে দুর্বল নেতা হিসেবে দেখতেন, যাকে বারবার রক্ষা করতে হয়েছে। সিরিয়ার যুদ্ধে সামরিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করার পরও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিদ্রোহী গোষ্ঠী, উত্তর-পূর্বের কুর্দি বাহিনী এবং প্রতিবেশী তুরস্কের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে আসাদের অনীহায় মস্কো ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়ে।

একাধিক সূত্রের ভাষ্য, এরপর রুশ কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের একটি তালিকা তৈরি করতে শুরু করে। সেই তালিকার শীর্ষের দিকেই ছিলেন আসমা আল-আসাদ।

শাসকগোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, বাশার আল-আসাদের উত্তরসূরি হিসেবে আসমাকে প্রেসিডেন্ট করার ধারণাটি রাশিয়ার পক্ষ থেকেই প্রথম উত্থাপিত হয়েছিল। আসাদ এ বিষয়ে জানতেন, তবে তাতে উদ্বিগ্ন ছিলেন না। সূত্রটির ভাষ্য, ‘এ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল এবং রাষ্ট্রপতিকে বিষয়টি জানানোও হয়েছিল। কিন্তু তিনি শুনে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।’

ডামাস্কাস শহরের উপকণ্ঠে বেসমেন্ট বা ভূগর্ভস্থ কক্ষগুলো থেকে সিরিয়ার সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা মানবদেহের অবশিষ্টাংশ উদ্ধার করেন। | ছবি: সংগৃহীত

এদিকে, রাজধানী দামেস্কের দিকে বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রা শুরু হলে বাশার আল-আসাদ নিজের পরবর্তী পদক্ষেপের পরিকল্পনা করতে থাকেন। ২০১৫ সাল থেকে শাসকগোষ্ঠীকে সামরিক সহায়তা দিয়ে আসা রাশিয়া তখন ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত ও দুর্বল অবস্থায় ছিল। ফলে মস্কোর কাছ থেকে আর আগের মতো সহায়তার আশা ছিল না। দীর্ঘদিনের দুর্নীতি ও ভেঙে পড়া মনোবলে জর্জরিত সিরীয় সেনাবাহিনীর অনেক সদস্য অস্ত্র ফেলে দেয়। তখন লড়াই চালিয়ে যাওয়াকে আর বাস্তবসম্মত বিকল্প বলে মনে হচ্ছিল না।

ফার্স্ট লেডি আসমা ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে লিউকেমিয়ার চিকিৎসার জন্য মস্কোতে ছিলেন। চিকিৎসার অংশ হিসেবে তার অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনও করা হয়। এটি ছিল তার দ্বিতীয়বার ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা। এর আগে ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট কার্যালয় জানিয়েছিল, তিনি স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন। পরের বছর তাকে সম্পূর্ণ সুস্থ ঘোষণা করা হয়।

২০২৪ সালের ২ ডিসেম্বরের সপ্তাহে আসমা জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের দামেস্কে ফিরে আসার নির্দেশ দেন। যারা সফরে ছিলেন, তাদের ভ্রমণ বাতিল করতে বলা হয়। সূত্রগুলোর দাবি, তাদের জানানো হয়েছিল যে সপ্তাহের শেষ দিকে ফার্স্ট লেডি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে যোগ দিতে দামেস্কে ফিরবেন।

তবে কর্মকর্তারা জানতেন না, ওই বৈঠকের ঘোষণা ছিল আসলে একটি ছদ্মাবরণ। ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর ভোরে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ জ্যেষ্ঠ ছেলে হাফেজ ও ছোট ছেলে করিমকে নিয়ে দামেস্কের কাছে একটি সামরিক বিমানঘাঁটি থেকে দেশ ছাড়েন। সেখান থেকে তারা প্রথমে রাশিয়ার একটি সামরিক ঘাঁটিতে এবং পরে মস্কোয় যান। সেখানে আসাদ পরিবারের অন্য সদস্যরা আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন এবং তাদের রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়া হয়েছিল।

২০০৮ সালে ডামাস্কাস শহরের দক্ষিণে একটি শহরের এতিম শিশুদের সঙ্গে আসাদ ও আসমা। | ছবি: সংগৃহীত

দ্য অবজারভার একজন প্রত্যক্ষদর্শীসহ কয়েকটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, শাসনব্যবস্থার পতনের রাতে আসমা আল-আসাদ ও তার বাবা তখনো সিরিয়ায় ছিলেন। তবে ফাওয়াজ আখরাস এ দাবি অস্বীকার করেছেন। তার ভাষ্য, লিউকেমিয়ার চিকিৎসার জন্য তিনি তখন মস্কোর একটি হাসপাতালে মেয়ের সঙ্গেই ছিলেন।

রোববার সকালে শাসকগোষ্ঠীর অনেক সদস্য ঘুম থেকে উঠে জানতে পারেন, প্রেসিডেন্ট দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন এবং বিদ্রোহীরা রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। অনুগত কর্মকর্তা ও ঘনিষ্ঠরা যখন আত্মগোপনের চেষ্টা করছিলেন, তখন টেলিভিশনের ফুটেজে দেখা যায়, রাস্তায় নিম্নপদস্থ কর্মকর্তাদের গণপিটুনিতে হত্যা করা হচ্ছে।

শাসকগোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ এক সূত্রের দাবি, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আসাদ পরিবার এমন ধারণা দিতে চেয়েছিল যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে এবং তাদের একটি পরিকল্পনা রয়েছে। এ কারণে অনেক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি দেশ ছেড়ে যাননি। বাস্তবে, দেশ ছাড়ার সুযোগটি কেবল নিজেদের জন্যই সংরক্ষিত রাখা হয়েছিল।

এ ঘটনায় পেছনে পড়ে থাকা শাসকগোষ্ঠীর অনুগতদের মধ্যে গভীর ক্ষোভ তৈরি হয়। এক সূত্রের ভাষ্য, ‘বিশ্ব এমন বিশ্বাসঘাতকতা আগে দেখেনি। এমনকি সাদ্দাম হোসেন বা মুয়াম্মার গাদ্দাফিও তাদের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে এমন আচরণ করেননি।’

সিরিয়ার দামেস্কে অবস্থিত প্যালেস্টাইন ব্রাঞ্চ কারাগার। | ছবি: সংগৃহীত

এদিকে, সিরিয়ায় শাসকগোষ্ঠীর কুখ্যাত নিরাপত্তা কাঠামোর কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন আতেফ নাজিব, যার বিরুদ্ধে বিপ্লবের শুরুতে দারায়া অঞ্চলে কিশোরদের নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। আছেন আমজাদ ইউসুফও, যিনি ‘তাদামানের কসাই’ নামে পরিচিত। তার বিরুদ্ধে দামেস্কের দক্ষিণের তাদামান এলাকায় কয়েক ডজন মানুষকে হত্যার নির্দেশ দেয়া এবং পৃথক ঘটনায় ছয় শিশুকে হত্যার অনুমোদন দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। গত মাসে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দুই থেকে ১২ বছর বয়সী কয়েকজন ভাইবোনকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে দেখা যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

তবে কয়েকটি আলোচিত গ্রেপ্তারের বাইরে নতুন সিরীয় সরকারের অন্তর্বর্তী বিচার কমিশন এখনো জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সুসংগঠিত কোনো পদক্ষেপ দেখাতে পারেনি। এ প্রক্রিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সমর্থন ও অর্থায়ন পাওয়ার চেষ্টাও খুব একটা সফল হয়নি। এর একটি কারণ, মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতায় ইইউর দীর্ঘদিনের অবস্থান। অথচ সিরিয়াসহ অধিকাংশ আরব দেশে এখনো মৃত্যুদণ্ডের বিধান বহাল রয়েছে।

শাসকগোষ্ঠীকে বিচারের মুখোমুখি করার আন্তর্জাতিক ও দেশিয় উদ্যোগ ধীরগতিতে এগোচ্ছে। ফলে নির্যাতনের শিকার মানুষদের এখনো অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তাদেরই একজন বিসান জুমা।

১৫ বছর বয়সে বিসান জুমাকে দামেস্কে মায়ের বাড়িতে যাওয়ার পথে একটি সরকারি তল্লাশিচৌকিতে গ্রেপ্তার করা হয়। তখন তার সঙ্গে ছিল ১৮ মাস বয়সী ছেলে এবং তিনি দ্বিতীয় সন্তানের গর্ভে ধারণ করছিলেন। জুমার একমাত্র ‘অপরাধ’ ছিল, তিনি একজন সরকারবিরোধী যোদ্ধার স্ত্রী। এরপর তাকে সাত বছরের বেশি সময় কারাবন্দী রাখা হয়।

২০১০ সালের ডিসেম্বরে প্যারিসের একটি রেস্তোরাঁয় আসাদ ও আসমা। | ছবি: সংগৃহীত

জুমার ভাষ্য, হাতকড়া পরা অবস্থায় তাকে সন্তান প্রসব করতে বাধ্য করা হয়েছিল। পরে তার দুই সন্তানকে তার কাছ থেকে নিয়ে আসমা আল-আসাদের প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত একটি এতিমখানায় রাখা হয়। জুমার মা ও বোন বারবার শিশু দু’টিকে পরিবারের জিম্মায় দেয়ার আবেদন করলেও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ তা প্রত্যাখ্যান করে।

জুমার দাবি, তার সন্তানেরা এতিমখানায় থাকার সময় আসমা সেখানে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘তিনি আমাদের কারাগারে পাঠিয়ে সন্তানদের অনাথ বানিয়েছেন। এরপর আবার এমনভাবে এতিমখানায় যেতেন, যেন তিনি খুবই দয়ালু।’

সমাজবিষয়ক সাবেক দুই মন্ত্রী, যারা এসব এতিমখানার তত্ত্বাবধান করতেন এবং শাসকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি অনুযায়ী ফার্স্ট লেডির নির্দেশে কাজ করতেন, শিশুদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগে এখন গ্রেপ্তার হয়েছেন।

বহু বছর পর দুই ছেলের সঙ্গে পুনর্মিলন হলেও বিসান জুমা এখনো উচ্চপর্যায়ের জবাবদিহির অপেক্ষায় আছেন। তিনি বলেন, ‘ওরা আমার সন্তানদের কেড়ে নিয়েছে। আমি যা সহ্য করেছি, তা যেন কাউকেই সহ্য করতে না হয়। ঈশ্বর যেন তাদের কখনো ক্ষমা না করেন।’

ভুক্তভোগীদের একজন বিসান জুমা | ছবি: সংগৃহীত

সিরিয়ার এতিমখানাগুলো নিয়ে এই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটি করা হয়েছে লাইটহাউস রিপোর্টস’র নেতৃত্বে সিরীয় ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের একটি যৌথ দলের সহযোগিতায়। দ্য অবজারভার অবলম্বনে অনুবাদ করেছেন নাজমুল হোসেন।

এনএইচ